মো: জিসান রহমান
,
মাভাবিপ্রবি প্রতিনিধি :
আজ ৪ অক্টোবর, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সহধর্মিণী বেগম আলেমা খাতুন ভাসানীর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০১ সালের এই দিনে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মহীয়সী এই নারীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন ভাসানীপ্রেমী, গবেষক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
জমিদার-কন্যা থেকে বিপ্লবীর সহধর্মিণী আলেমা খাতুন ছিলেন ততকালীন বগুড়া (বর্তমানে জয়পুরহাট) জেলার পাঁচবিবির মহিপুরের এক নামকরা জমিদার পরিবারের সন্তান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার হুলিয়া জারি করলে তিনি আত্মগোপনে ‘মুনশি’ পরিচয়ে আলেমা খাতুনের বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। কিন্তু রতনে যেমন রতন চিনে নেয়, আলেমা খাতুনের বাবাও সেদিন আবদুল হামিদ খাঁ-র ভেতরের তেজ ও সত্যকে চিনতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯২৫ সালের দিকে জমিদার-কন্যা আলেমা খাতুনের সাথে মওলানা ভাসানীর বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বিপুল সম্পদ জনগণের তরে উৎসর্গ বিয়ের পর পিতালয় থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হন আলেমা খাতুন। কবি মোঃ মাহবুব উল আলম তাঁর ‘স্বাধীনতার চাষী’ কাব্যগ্রন্থে এই ত্যাগের চিত্র তুলে ধরে লিখেছেন,”পাঁচবিবিতে মহীপুরে পত্নী আলেমা,বাপের থেকে পেয়েছিলেন বিপুল জমিজমা, এগারো শত একর ছিল মোট পরিমাণ তার,যাহার আয়ে চলতে পারে কয়েকশো সংসার। মওলানা ক’ন, “রাগ করোনা, শোনো! বাবুর মা’দুই দিনের এই দুনিয়াদারী, চিরদিনের না।> তোমার জমি খোদার রাহে ওয়াক্ফ করে দাও,আখেরাতে জান্নাতের এক টিকিট কিনে নাও।” আলেমা ক’ন “ঠিক আছে গো, বেহেস্ত এখন থাক,আপনি যা চান তাহাই এখন পূরণ হয়ে যাক।”
স্বামীর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি অকাতরে বিলিয়ে দেন তাঁর প্রায় ৬০ বিঘা/১১০০ একর জমি। সেই জমিতে গড়ে ওঠে ‘হক্কুল এবাদ মিশন’—যার অধীনে স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরিসহ নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন মওলানা ভাসানী। বিরান মাঠে জেগে ওঠে প্রাণের কলরব।
আতিথেয়তা ও সংগ্রামের আড়ালে এক নিরব আলো,মওলানা ভাসানীর জীবনযাত্রা ছিল সাধারণ মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি বিশ্বনেতা হয়েও বাস করতেন কুঁড়েঘরে, বিচরণ করতেন সর্বহারা কৃষক-শ্রমিকের মাঝে। বছরের পর বছর কাটাতেন আন্দোলন ও কারাগারে। এমন প্রতিকূল জীবনযাত্রাকে পরম আনন্দে নিজের করে নিয়েছিলেন জমিদার-কন্যা আলেমা খাতুন।
তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, উঠতি রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে গ্রামের সাধারণ কৃষক-শ্রমিক। মওলানা ভাসানীকে উসিলা করে বহু নেতা ক্ষমতার শিখরে পৌঁছে পরবর্তীতে তাঁর অবদান ভুলে গেলেও, আলেমা খাতুন আমৃত্যু নিঃস্বার্থভাবে মওলানার পাশে থেকে নীরবে সব প্রতিকূলতা সামলে গেছেন।
টাঙ্গাইলে মওলানা ভাসানীর মাজার শরীফের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই মহীয়সী নারী। তাঁর স্মৃতি ও অবদানকে অমর করে রাখতে ‘মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ (মাভাবিপ্রবি)-এ একটি ছাত্রী হলের নামকরণ করা হয়েছে ‘আলেমা খাতুন ভাসানী হল’।
স্বামীর রাজনৈতিক সংগ্রামের নেপথ্য শক্তি হিসেবে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া এই চিরস্মরণীয় নারীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।











