টাঙ্গাইল সদর সংবাদ দাতা
চমচম, সন্দেশ, জিলাপি, রসগোল্লা, কাঁচা গোল্লা, সাদা দইসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির সমারোহে জমে উঠেছে টাঙ্গাইলের প্রথম ‘সুইট ফেস্টিভ্যাল’। শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে বসা তিন দিনের এ মেলায় জেলার ১২ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি এক জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে। মিষ্টি খাওয়া ও কেনার পাশাপাশি স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবের মূল লক্ষ্য জেলার শতবর্ষের মিষ্টি তৈরির ঐতিহ্য, পর্যটন সম্ভাবনা ও স্থানীয় পণ্যকে দেশ-বিদেশে তুলে ধরা। উৎসবে জেলার ১২ উপজেলা থেকে মোট ২৩টি স্টল অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ২০টি স্টলে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি এবং তিনটি স্টলে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। এ সময় জেলা প্রশাসক শরীফা হক, পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার, জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানুসহ বিভিন্ন উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মেলায় টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চমচম, মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কীর সন্দেশ, মধুপুর উপজেলার জিলাপি ও গারো বাজারের রসগোল্লা, নাগরপুর উপজেলার কাঁচা গোল্লা, বাসাইল উপজেলার সাদা দইসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার প্রসিদ্ধ মিষ্টি স্থান পেয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাতে উৎসবের তৃতীয় ও শেষ দিন। গত দুই দিন বৃষ্টি উপেক্ষা করেও মেলা প্রাঙ্গণে ছিল বিভিন্ন বয়সী মানুষের ভিড়। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে অনেকে মেলায় এসে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি পছন্দের মিষ্টি বাড়ির জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
টাঙ্গাইল শহরের বাসিন্দা বর্ণ দাস এবার এসএসসি পাস করেছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকার নানা ধরনের মিষ্টির নাম শুনলেও অনেকগুলোর স্বাদ নেওয়ার সুযোগ হয়নি তাঁর। মেলায় এসে একসঙ্গে এত ধরনের মিষ্টি দেখে ও খেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি।
মেলায় আসা গৃহিণী লিমু আক্তার বলেন, অনেক নতুন ধরনের মিষ্টি দেখেছেন এবং খেয়েছেন। এক মাঠে জেলার বিভিন্ন এলাকার এত মিষ্টি একসঙ্গে দেখে তাঁর ভালো লেগেছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেও মেলায় মানুষের উপস্থিতি কমেনি বলেও জানান তিনি।
সদর উপজেলার গালা ইউনিয়নের বাসিন্দা দুলাল মিয়া পরিবার নিয়ে মেলায় এসেছেন। তিনি বলেন, মিষ্টির জন্য টাঙ্গাইলের অনেক সুনাম রয়েছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে নানা ধরনের মিষ্টি তৈরি হয়। ছোট মেয়েকে এসব ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই তাঁকে নিয়ে মেলায় এসেছেন।
মানিকগঞ্জ থেকে ব্যক্তিগত কাজে টাঙ্গাইলে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা মিজানুর রহমানও মিষ্টি উৎসবের কথা শুনে মেলায় ঘুরতে আসেন। বিভিন্ন মিষ্টির স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি বাড়ির জন্যও মিষ্টি কিনে নিয়ে যান তিনি।
টাঙ্গাইলে এর আগে এমন আয়োজন হয়নি উল্লেখ করে সরকারি মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা বলেন, এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে দেশীয় ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর এমন আয়োজন করা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
মেলায় অংশ নেওয়া জয়কালী মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক ও টাঙ্গাইল জেলা মিষ্টি ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি স্বপন ঘোষ বলেন, মেলায় মানুষের ভালো উপস্থিতি রয়েছে। মিষ্টির প্রতি মানুষের আগ্রহ আগেও ছিল, এখনো তা দেখা যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এ মিষ্টি উৎসব সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, টাঙ্গাইলের চমচম সারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় পরিচিত। টাঙ্গাইলের শাড়ি যেমন বাংলাদেশের গর্ব ও ঐতিহ্য, তেমনি চমচমও জেলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে আরও এগিয়ে নেওয়া সবার দায়িত্ব।
জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, টাঙ্গাইলের জিআই পণ্য শুধু জেলার সম্পদ নয়, এগুলো বাংলাদেশের গর্ব। সেই বার্তা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়াই উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জেলার পর্যটন সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যকে ধারণ করে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা এবং স্থানীয় পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাও এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।











