জাহাঙ্গীর হোসেন
,
মির্জাপুর প্রতিনিধিঃ
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ভ্রাম্যমাণ সুপারশপ “প্লাস্টিক এক্সেঞ্জ স্টোর” এর মাধ্যমে পরিত্যাক্ত প্লাস্টিক কালেক্ট করা হয়েছে। মঙ্গলবার উপজেলা সদরের এস কে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সকাল ১০ টা হতে সন্ধ্যা ৬ টা পযন্ত এ কার্যক্রম চলে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের আর্থিক সহায়তায় এই কাযক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পরিবেশ বাঁচাতে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩ লক্ষ কেজি পরিত্যক্ত প্লাস্টিক রিসাইকেল করেছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।
মির্জাপুরের সুপারশপে প্রায় ৮০০ কেজি প্লাস্টিক জমা দিয়ে ৩০০ পরিবার বাজার করেন। এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩ শতাধিক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ফান এক্টিভিটিস এর মাধ্যমে এনগেজ করে পুরস্কৃত করা হয়। এসময় প্লাস্টিকের দূষণ সম্পর্কে আগতদের সচেতন করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায় এস কে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের বিশাল অংশ সামিয়ানা টাঙিয়ে সুপারশপের মালামাল ডিসপ্লে করা হয়। প্রায় ১৯ ধরনের নিত্যপন্য দিয়ে সুপারশপ সাজিয়েছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা কর্মী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা। যেখানে ১ কেজি প্লাস্টিক দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে ৫ টি ডিম, ১ কেজি প্লাস্টিকে ১ কেজি চাল, ৫ কেজি প্লাস্টিকে ১ লি: তেল, ২ কেজি প্লাস্টিকে ১ কেজি ডাল ইত্যাদি।
এই কাযক্রমে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক, স্ট্যান্ডার্ড চারটারড ব্যাংকের অফিসাররা, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী ও বিভিন্ন ইয়ুথ প্লাটফর্ম এর সদস্যরা।
বিকেল ৪ টায় এই কাযক্রম পরিদর্শন করেন স্ট্যান্ডার্ড চারটারড ফাউন্ডেশন এর গ্লোবাল হ্যাড নলিনি তারাকেশ্বর ও ব্যাংকটির বাংলাদেশ অফিসের হ্যাড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড & মার্কেটিং বিটপী দাশ চৌধুরী।
তিনি বলেন “নদীমাতৃক এই দেশের প্রাণপ্রবাহ বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণে বিপন্ন প্রাণীকুলকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। এই পৃথিবীকে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত ও বাসযোগ্য রাখতে হলে সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। পৃথিবীকে প্লাস্টিক দূষণ থেকে রক্ষা করতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে” প্লাস্টিক দিয়ে বাজার করতে আসা মধ্যপাড়ার বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন “মাইকিং শুনে ১ সপ্তাহ ধরে প্লাস্টিক কুড়িয়ে ১০ কেজি প্লাস্টিক জমিয়েছি। এগুলো দিয়ে আজ প্রায় ৬০০-৭০০ টাকার বাজার করেছি।
এগুলো ভাংগারির দোকানে নিয়ে গেলে ২০০ টাকার বেশি পেতামনা। এরকম বাজার বার বার বসলে আমি আ শপাশ থেকে প্লাস্টিক কুড়িয়ে জমিয়ে রাখব” বিদ্যানন্দের বোর্ড সদস্য মো: জামাল উদ্দিন বলেন: প্লাস্টিক দূষনের মাত্রা এতই ব্যাপক যে এটি সরকারের একার পক্ষে রোধ করা একেবারেই অসম্ভব। এই দূষন কমাতে দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা। তাই মানুষকে সম্পৃক্ত করতেই স্ট্যান্ডার্ড চারটারড ব্যাংক এর সহযোগিতায় আমরা সারাদেশে প্লাস্টিক এক্সেঞ্জ স্টোর চালু করছি। আশা করছি এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্লাস্টিকের ভয়াবহতা সম্বন্ধে আমরা জনগনকে ধারনা দিতে পারব ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে ও প্লাস্টিক বরজ্য ম্যানেজমেন্টে সরকারের যে বিপুল ব্যয় তা আমাদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে কিছুটা হলেও কমাতে সক্ষম হবো”।
একটি টেকসই অলাভজনক বিজনেস মডেল: ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য জামাল উদ্দিন আরো জানান “এটি একটি টেকসই অলাভজনক বিজনেস মডেল” হিসেবে আমরা ডিজাইন করেছি। প্রথম বছর আমরা প্রতি কেজি প্লাস্টিকে ৩০-৪০ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছি। যেমন প্রতি কেজি প্লাস্টিকের বিনিময়ে এভারেজ ৬০ টাকার পণ্য দিলেও, সেই প্লাস্টিক রিসাইকেল কোম্পানির কাছে বিক্রি করে পাচ্ছি প্রতি কেজিতে এভারেজ ৩০ টাকার কম। ২ লাখ কেজি প্লাস্টিক রিসাইকেল করতে আমরা পণ্য দিয়েছি ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার। প্লাস্টিক বিক্রি করে রিসাইকেল কোম্পানি থেকে পেয়েছি ৭৮ লক্ষ টাকা। তাহলে পরবর্তী বছর একই পরিমাণ প্লাস্টিক রিসাইকেল করতে আমাদের ভর্তুকি দিতে হবে ৫০% কম। এভাবে ফান্ড রিরোলিং হয়ে ৩য় বছরের পর একই পরিমাণ প্লাস্টিক রিসাইকেল করতে কোন ভর্তুকিই প্রয়োজন হবেনা। প্রকল্পটি কোন প্রকার অনুদান ছাড়াই স্বাধীনভাবে চলবে। একই পরিমান প্লাস্টিক রিসাইকেল করতে বিদ্যানন্দ শুধু এডমিন কস্ট চালিয়ে যাবে ডোনারদের সহযোগীতায় যেটা খুবই মিনিমাম হয় স্বেচ্ছাসেবীদের স্বেচ্ছাশ্রমের বিনিময়ে।
আয়োজক সুত্র জানায়; ২০২২ সালে সর্বপ্রথম প্রবাল দ্বীপ সেন্টমারটিনে বিদ্যানন্দ চালু করে “প্লাস্টিক এক্সেঞ্জ স্টোর”। সেন্টমারটিনে প্লাস্টিক বরজ্য ম্যানেজমেন্টের কোন ব্যবস্থা নেই, নেই কোন রিসাইকেল সিস্টেম কিংবা ভাংগারির দোকান। ফলে প্রবাল দ্বীপের মানুষের কাছে প্লাস্টিক একেবারেরি মূল্যহীন। তাই তারা প্লাস্টিক যত্রতত্র ফেলে রাখে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন এই আইডিয়ার মাধ্যমে সেন্টমারটিনের প্লাস্টিককে ” মুদ্রায়” রুপান্তর করে৷ দ্বীপের মানুষ পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বিনিময়ে বাজার করার সুযোগ পায়।
ফলে একদিকে যেমন দ্বীপ ও সমুদ্র প্লাস্টিক দূষনমুক্ত হচ্ছে তেমনি দ্বীপের অভাবী মানুষ প্রায় বিনামুল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার পাচ্ছে। সেন্টমারটিনে এই প্রকল্পের অভাবনীয় সাফল্যের পর দেশব্যাপী এটা চালুর চিন্তা মাথায় আস আয়োজকদের। এখন পর্যন্ত স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে ৩ লক্ষ কেজি পরিত্যক্ত প্লাস্টিক রিসাইকেল করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও বিদ্যানন্দ! দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৩৫২ টি সুপারশপ পরিচালনা করা হয়েছে বলে
বিদ্যানন্দের বোর্ড সদস্য মো: জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন।











