বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, আমি বিভিন্ন জায়গায় শুনতে পাচ্ছি, যারা আমাদের মতো মজলুম ছিলেন সাড়ে পনেরো বছর, তারা এখন ভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন, চাঁদাবাজি করছেন, দুর্নীতি করছেন, মামলা বাণিজ্য, দখল বাণিজ্য করছেন। শুধু তাই না, এখন নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য নির্বাচনী এজেন্টদেরকে ঘরে ঘরে গিয়ে নাকি তারা হুমকি দিচ্ছেন। ভুলে যান, সেদিনের কবর রচনা হয়ে গেছে। আমার ভোট আমি দিব, তোমারটাও আমি দিব, এই দিন এখন আর নাই। আপনার ভোট আপনি দিবেন, আমারটা আমি দেব ইনশাআল্লাহ। আপনার পছন্দমতো আপনার ভোট দেন। আঠারো কোটি মানুষ তাদের পছন্দ মতো তাদের ভোট দেবে। এখানে আবার গায়ের শক্তি, কালো টাকা, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ম্যানুভারিং কিছুই মানা হবে না।
তিনি বুধবার বিকেলে টাঙ্গাইলে ১১ দলীয় ঐক্য জোট আয়োজিত নির্বাচনী সভায় বক্তৃতাকালে এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমরা সিজনাল পলিটিশিয়ান না। আমরা বসন্তের কোকিল না। যখন নির্বাচন আসবে তখন এসে নতুন রঙ ধারণ করে, সুন্দর সুন্দর কথা নিয়ে আমরা হাজির হব না। আপনারা সাক্ষী সাড়ে পনেরো বৎসর আমাদের উপর এত জুলুম হওয়ার পরেও আমরা একদিনের জন্য জনগণকে ছেড়ে কোথাও যাইনি। এই মাটি কামড় দিয়েই আমরা ছিলাম। আল্লাহ আমাদেরকে এখানে রেখেছিলেন। দফায় দফায় জেলে গিয়েছি, ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছি, অফিসে ঢুকতে পারি নাই। কিন্তু বাংলাদেশে ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ! এখনও আল্লাহ রেখেছেন। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে সুদিন দুর্দিন কি আসবে আল্লাহ ভালো জানেন। কথা দিচ্ছি, বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যাব না, ইনশাআল্লাহ। আছি, থাকব। আপনাদের সুখেও থাকব, ইনশাআল্লাহ দুঃখেও থাকব। আমরা এখন একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। এই স্বপ্ন কার? এটা আমার না। এটা জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাদের। তারা যে দেশটা দেখতে চেয়েছিল, আমরা সেই দেশটা গড়ার জন্য শপথ নিয়েছি। আপনারা আমাদের সাথে ইনশাআল্লাহ থাকবেন ইনশাআল্লাহ।
শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সবচাইতে বড় মজলুম সংগঠন বাংলাদেশে। আর কোন সংগঠনের শীর্ষ এগারো জন নেতাকে শেখ হাসিনার সরকার খুন করে নাই। আর কোন সংগঠনের নিবন্ধন কেড়ে নেয় নাই। আর কোন সংগঠনের প্রতীক কেড়ে নেয় নাই। আর কোন সংগঠনের সমস্ত অফিসগুলো তালাবদ্ধ করে রাখে নাই। আর কোন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় নাই। আর কোন সংগঠনকে শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় নাই। এটা একমাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
তিনি বলেন, তবে আমরা বিশ্বাস করি, যারা সরকারের বাইরে বিরোধী দল, আমরা সকলেই মজলুম ছিলাম। শুধু বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরা মজলুম ছিলেন না, এ দেশের আঠারো কোটি মানুষ মজলুম ছিল। আলেম ওলামা মজলুম ছিলেন, ছাত্র-জনতা মজলুম ছিল, সাংবাদিক বন্ধুরা মজলুম ছিল, সুশীল সমাজের সদস্যরা মজলুম ছিল, ব্যবসায়ীরা মজলুম ছিল, কৃষক শ্রমিক সকলেই মজলুম ছিল। আগস্টের পাঁচ তারিখ যখন আল্লাহ তাআলা সাময়িক মুক্তির ব্যবস্থা করে দিলেন, সেই মজলুম সংগঠন জামায়াতে ইসলামী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার জন্য মিছিল বের করে নাই। নির্বাচন দাবি করে নাই। কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয় নাই। হাজার হাজার মামলা বাণিজ্য করে মানুষকে হয়রানি করার সিদ্ধান্ত নেয় নাই। বরঞ্চ আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করার জন্য সেজদায় পড়েছে। যে আল্লাহ তাআলা জগদ্দল পাথরের ফ্যাসিজমের হাত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ! আমরা সে রাতেই ঘোষণা করেছিলাম, কারো উপর থেকে আমরা প্রতিশোধ নেব না। এ জাতি সাক্ষী, আঠারো কোটি মানুষ সাক্ষী। একটা মানুষের উপরও আমরা প্রতিশোধ নেই নাই। আমরা বলেছিলাম, আমাদের কর্মীরা, সহকর্মীরা আর্থিকভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু তাই বলে হারাম পথ আমাদের কর্মীদের উপার্জনের রাস্তা নয়। আমরা চান্দাবাজি করব না। চান্দাবাজি আমরা করি নাই। আমরা বলেছিলাম, যারা আমাদেরকে মামলা দিয়ে দফায় দফায় জেলে নিয়েছে, কষ্ট দিয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে আমাদের উপর নির্যাতন করেছে, আমাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায় করেছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মামলা দেব না।
তিনি বলেন, আগামী ১২ তারিখের টার্নিং পয়েন্টে জাতির ভাগ্য বদলে দেওয়ার জায়গায় ঐতিহাসিক দায়িত্ব আমাদেরকে পালন করতে হবে ইনশাআল্লাহ। জুলাইয়ের যুবকেরা, তোমাদের কি শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে? এখনো সজাগ আছো? মুখে বল আছে? ইনশাআল্লাহ! একটা সুষ্ঠু নির্বাচন এই জাতি আগামী ১২ তারিখ আদায় করে ছাড়বে ইনশাআল্লাহ।
শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের মা বোনেরা বড় ঋণী করেছেন। জুলাই আন্দোলন চলাকালে ১৫ তারিখ আমাদের মেয়েদের গায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন হাত দেওয়া হয়, সারা বাংলাদেশে আগুন জ্বলে উঠেছিল। আমরা মায়েদের কাছে ঋণী। ১৬ তারিখ আবু সাইদ চিৎকার দিয়েছে, উত্তরবঙ্গে দাঁড়িয়ে, ‘আমার অধিকার আমাকে দে, না হয় আমাকে একটা গুলি দে।’ সে বলেছিল, ‘বুকের ভিতরে তুমুল ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ জাতির জন্য বুকে গুলি লুফে নিয়েছে, পিঠে নেয় নাই। কারণ সে বীর সন্তান। বন্ধুগণ, সেদিন অনেকে বাধ্য হয়ে স্বৈরশাসকের হুকুম পালন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমরা জাতিকে নিয়ে পিছনে যেতে চাই না। আমরা জাতিকে নিয়ে সামনে যেতে চাই। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যে বাংলাদেশে শিশুটি উপযুক্ত শিক্ষা পাবে। উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে সুস্থ হয়ে বড় হওয়ার জন্য স্বাস্থ্য সেবা পাবে, নিরাপদ রাস্তা পাবে, নিরাপদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাবে। এরপরে যখন বড় হবে, হাতের মধ্যে কাজ পাবে। এরপরে যখন আরও বড় হবে, দেশটাকে গড়ে দেবে। আমরা সেই বাংলাদেশটা চাই, যেই বাংলাদেশে আমার মা, আমার বোন, আমার মেয়ের শতভাগ নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত হবে, ইনশাআল্লাহ। এটা ঘরে, রাস্তায়, কর্মস্থলে যেখানেই হোক, সব জায়গায় একই হবে। আমরা সেই বাংলাদেশ চাই, যে বাংলাদেশে মানুষ তার যোগ্যতা এবং তার অবদান অনুযায়ী মূল্যায়িত হবে।
পরে শফিকুর রহমান টাঙ্গাইলের আটটি আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি সাতটি আসনের জামায়ামে ইসলামীর প্রার্থীদের হাতে দাড়িপাল্লা এবং একটি আসনে প্রার্থীর হাতে শাপলা কলি তুলে দেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা হলেন, টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আব্দুল্লাহেল কাফি, টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) হুমায়ুন কবির, টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আব্দুর রাজ্জাক, টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আহসান হাবীব মাসুদ, টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আব্দুল হামিদ, টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আব্দুল্লাহ তালুকদার, ও টঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) মো. শফিকুল ইসলাম। শাপলা কলি তুলে দেন টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে এনসিপির প্রার্থী সাইফুল্লাহ হায়দারের হাতে।
জামায়াতের এই নির্বাচনী সভায় যোগ দিতে সকাল থেকেই দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকরা সভাস্থলে আসতে শুরু করেন। দুপুরের মধ্যে সভাস্থল ও আশেপাশের এলাকা মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। আশেপাশের রাস্তাও জনসভায় আগত মানুষে ভরে যায়।










