আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশের নির্বাচনী ব্যয় বড় আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রচারণা ব্যয়ও আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বাড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন পরিচালনা, ভোটগ্রহণ সামগ্রী, প্রশিক্ষণ, পরিবহন, ভাতা ও নিরাপত্তা খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। কাগজ, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব নির্বাচনী বাজেটেও পড়েছে। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব পালনে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সূত্র জানায়, আগামী জানুয়ারি মাসের ১২ তারিখ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এই ধারণার ভিত্তিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। তবে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট যুক্ত হওয়ায় প্রচারণা, ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক কার্যক্রমের পরিসর বেড়ে গেছে। ফলে সংশোধিত বাজেটে অতিরিক্ত ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা যোগ করে মোট বরাদ্দ ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চেয়ে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি চিঠি পাঠায়। গতকাল বুধবার অর্থ বিভাগ সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়। মূলত নির্বাচন ও গণভোটের প্রচার-প্রচারণা, জনসচেতনতা কার্যক্রম এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের কারণেই বাড়তি এই ব্যয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ও সাবেক নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনী ব্যয় এখন বড় আকার ধারণ করেছে। কয়েকশ কোটি টাকা থেকে এই ব্যয় বেড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ যৌক্তিকভাবে ব্যয় নির্ধারণ করা হলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সরকারকে দেওয়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের জন্য নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতনের বাইরে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ভাতা দেওয়া হয়, একইভাবে নানা খাতে অযৌক্তিকভাবে ব্যয় বাড়ানো হয়—এসব বিষয় পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনের প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে মূল বাজেটে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩৩ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৭৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা করা হয়েছে, যা প্রায় ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনার ব্যয় ছয় গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি টাকায়। পরিবহন খাতে ব্যয় ৬৩ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ কোটি ১২ লাখ টাকা।
এ ছাড়া মুদ্রণ ও বাঁধাই খাতে বরাদ্দ বেড়ে ১০৮ কোটি টাকা এবং অন্যান্য মনিহারি খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮১ কোটি টাকায়। এই দুই খাতে ব্যয় যথাক্রমে ২০৮ শতাংশ ও ৩১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যালট বাক্স খাতেও ব্যয় এক কোটি টাকা থেকে বেড়ে পাঁচ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। সম্মানী ভাতায় ব্যয় ৪৯৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫১৫ কোটি টাকা, আপ্যায়নে ২২০ কোটি থেকে ২৯০ কোটি এবং খোরাকি ভাতা ৫১২ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৩০ কোটি টাকা করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনী ব্যয়ের প্রায় ২০টি খাতের মধ্যে ১৭টিতেই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে বিভিন্ন নির্বাচন আয়োজনের জন্য ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। তবে ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এই বিবেচনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে ইসির জন্য মোট বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয় ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ছিল ২ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ২২৯ কোটি টাকা। এই বরাদ্দের মধ্যেই সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা রাখা হয়েছিল, যার সঙ্গে এখন অতিরিক্ত ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা যোগ হয়েছে।
আগের অর্থবছরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৪ হাজার ১৯০ কোটি টাকা করা হয়, যার মধ্যে নির্বাচনী ব্যয় ছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাতীয় নির্বাচন না থাকায় ইসির মোট ব্যয় ছিল মাত্র ৮৭৮ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
দেশে এ পর্যন্ত তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। তবে এসব গণভোট সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এক দিনে হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট যুক্ত হলে প্রস্তুতির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ভোটকেন্দ্র ও ভোট গ্রহণ কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়াতে হয়, পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়।
এবারের গণভোটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে যুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে প্রচারণা চালালেও গণভোটে কোনো প্রার্থী বা প্রতীক থাকে না। ফলে ভোটারদের বিষয়টি বোঝাতে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত আলাদা জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হয়, যা নির্বাচন কমিশনকেই করতে হবে। এ কারণেই নির্বাচনী কার্যক্রমের পরিধি বাড়ছে এবং ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইসি সূত্র আরও জানায়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে দেশে ও বিদেশে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। গত ৫ জানুয়ারি মধ্যরাতে অ্যাপের মাধ্যমে এই নিবন্ধনের সময়সীমা শেষ হয়েছে।
প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মোট পোস্টাল ব্যালট নিবন্ধনের মধ্যে বিশ্বের ১২৩টি দেশ থেকে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী বাংলাদেশি নিবন্ধন করেছেন। এসব প্রবাসী ভোটারের প্রতিটি ভোটগ্রহণে সরকারের গড়ে প্রায় ৭০০ টাকা ব্যয় হবে বলে হিসাব করা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের ব্যয় যে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, অতিরিক্ত যে অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, তার পুরোটা গণভোটের জন্য ব্যয় হবে—এমনটি নয়। তার ভাষ্য, গণভোটে এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজনও পড়বে না। মূল বাজেটে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা দিয়ে সব নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব নয় বলেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—উভয় আয়োজনের জন্য সামগ্রিকভাবে বাড়তি অর্থ চাওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র : সমকাল











