খবরবাংলা
,
ডেস্ক
মার্কিন সাংবাদিক জন রীডের আলোচিত গ্রন্থ ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ যেমন ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের ইতিহাস তুলে ধরে, তেমনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ১০ দিন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এনে দিয়েছে এক নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন। এই সময়কাল হয়তো বিশ্ব কাঁপায়নি, তবে বাংলাদেশের মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস, আশা ও ঐক্যের নতুন আলো জ্বালিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়টি ছিল ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ। শোক আর প্রত্যাশার যুগলবন্দিতে দেশ এগিয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন: রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট
গত ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই প্রত্যাবর্তনকে অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন।
এর আগের সময়টিতে নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি—সব মিলিয়ে দেশ ছিল চরম অস্থিরতায়। এমন প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের দেশে ফেরা রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ ও স্থিতিশীলতার বার্তা দেয়।
প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে দেওয়া প্রথম বক্তব্যেই তিনি ঐক্য, সহনশীলতা ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এতে অনেকেই তাকে ভবিষ্যতের কাণ্ডারি হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্বাচনী অনিশ্চয়তার অবসান তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও ইতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হয়। প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাকে ‘ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে যায়।
এতে উজ্জীবিত হয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনী প্রচারণায় গতি আনে।
খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ও জাতীয় ঐক্যের বিরল দৃশ্য তারেক রহমানের দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ৩০ ডিসেম্বর, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। এই মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা দেশ। অন্তর্বর্তী সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে শেষ বিদায় জানানো হয়।
তার জানাজায় স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জনসমাগম হয়, যা প্রমাণ করে—বাংলাদেশের মানুষ সংকটে ঐক্যবদ্ধ হতে জানে। রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে মানুষ এক কাতারে দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক সৌজন্য ও কূটনৈতিক তাৎপর্য বেগম জিয়ার প্রয়াণের পর জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তারেক রহমানকে সমবেদনা জানান, যা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত রাজনৈতিক সৌজন্যের একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে তারেক রহমানের বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও সংলাপের কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে, বেগম জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ৩২টি দেশের কূটনীতিকের উপস্থিতি এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েনে এক ধরনের স্বস্তির বার্তা দেয়।
এক নতুন বাংলাদেশের সূচনা? ২৫ ডিসেম্বরের আগের বাংলাদেশ ছিল বিভক্ত ও উদ্বিগ্ন। আর পরের বাংলাদেশ যেন তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী ও স্থিতিশীলতার পথে অগ্রসর। এই দশ দিনে কোনো রক্তক্ষয়ী বিপ্লব হয়নি, কিন্তু ঘটেছে এক নীরব রাজনৈতিক রূপান্তর।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়কালই হয়তো নতুন বাংলাদেশের যাত্রার সূচনা—যেখানে বিভাজনের বদলে সংলাপ, সংঘাতের বদলে ঐক্য সামনে আসছে।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











