খবরবাংলা ডেস্ক :
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে। এ নীতির মূল লক্ষ্য দেশের জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জনগণকেন্দ্রিক কূটনীতি প্রতিষ্ঠা করা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, অন্য কোনো দেশের সরকার বা জনগণের স্বার্থ বিবেচনার আগে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়াই এ নীতির মূল বৈশিষ্ট্য।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ওই নীতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও এ দেশের জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।
শামা ওবায়েদ বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক বলয়ের দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেই বাংলাদেশ স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস না করে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বাড়ানো।
তিনি জানান, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের দেশগুলো, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় সরকার।
অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বিনিয়োগে গুরুত্ব
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে বাস্তববাদী ও বাস্তবভিত্তিক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করেছে।
তাঁর মতে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন এবং প্রযুক্তির বিকাশ জরুরি। এ কারণে সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, কোনো উদ্যোগ বা অংশীদারত্ব দেশের জন্য কী ধরনের সুফল বয়ে আনবে, তা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ, ব্রিকস, সার্ক ও বিমসটেকের মতো বহুপক্ষীয় ও আঞ্চলিক কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে তিনি পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখেন না।
‘বন্ধু চাই, প্রভু নয়’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অধীনতামূলক প্রবণতা থেকে সরে আসার একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরীর অভিযোগ, আগের সরকার ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছিল। তাঁর মতে, কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের নীতি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এ নীতি অনুসরণের কথা বলা হলেও বাস্তবে আগের সরকার অধীনতামূলক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশের স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত না করেই ভারতকে ট্রানজিট সুবিধাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
এর বিপরীতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি সার্বভৌমত্ব, সমতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন, তবে কোনো দেশের অধীনস্থ অবস্থান গ্রহণ করা উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত—‘বন্ধু চাই, প্রভু নয়’।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফরকালে কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে বাংলাদেশকে সামরিক জোটে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। তবে অর্থনৈতিক চুক্তি ও অংশীদারত্বে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।
রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধান এবং অর্থনৈতিক কূটনীতি সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী। তাঁর মতে, বাংলাদেশের শাকসবজি ও মাছের বিদেশে চাহিদা থাকায় প্রচলিত রপ্তানি খাতের বাইরেও নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।
কূটনৈতিক সাফল্যে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা জরুরি
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপর।
তিনি বলেন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর করতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি, সুশাসন এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন। বাইরের বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সীমিত হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে।
হুমায়ুন কবির স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের জন্য তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। এগুলো হলো জাতীয় শক্তির সংহতি, বাংলাদেশের প্রয়োজনের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ সামলানোর কূটনৈতিক দক্ষতা।
তাঁর মতে, রাজনৈতিক আবেগের পরিবর্তে বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে, কোন দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশ কী প্রত্যাশা করে। দেশের স্বার্থকে সামনে রেখেই বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা করা উচিত।
সার্ক পুনরুজ্জীবনে উদ্যোগ
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করাকে সরকারের আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
তিনি জানান, সার্ককে কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, সে বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ তৈরি করে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শামা ওবায়েদ বলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সার্ক ও বিমসটেক—উভয় সংস্থাই ভূমিকা রাখতে পারে। সংস্থা দুটি পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন, কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা ভূরাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে এককভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











