বিশেষ প্রতিবেদক :
টাঙ্গাইলের মির্জপুরে দরপত্র আহবান না করেই প্রায় দেড় কোটি ঘনফুট সরকারি বালু বিক্রির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কর্তৃক বংশাই নদী খনন করা ১০টি স্থানে রাখা হয় ওই সরকারি বালু।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউএনওর সহযোগিতায় কোন প্রকার দরপত্র ছাড়াই এক কোটি ৪০ লাখ ২৩ হাজার ৬৯১ ঘনফুট বালু বিক্রি শুরু করেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এ নিয়ে পুরো উপজেলা জুড়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা। এদিকে ইউএনও বলছেন, নিয়ম মেনেই স্থানীয়দের বালু বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, ২০২২ সালে মির্জাপুর উপজেলার বংশাই নদী খননের কাজ পায় অভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। প্রতিষ্ঠানটি খনন শেষে নদী থেকে উত্তোলিত বালু উপজেলার তরফপুর, লতিফপুর, ভাদগ্রাম এবং গোড়াই এলাকায় বিভিন্ন জমি ভাড়া নিয়ে এবং খাস জায়গায় রেখে দেয়া হয়। পরবর্তীতে এই উত্তোলিত বালু পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা প্রশাসন এবং বিআইডব্লিউটিএ এর যৌথ সমন্বয়ে পরিমাপ করে এক কোটি ৪০ লাখ ২৩ হাজার ৬৯১ ঘন ফুট বালু জেলা প্রশাসককে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে গত ৬ জুলাই সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক শরীফা হকের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ২০২৫ এর নীতিমালা মোতাবেক এবং সবার সম্মতি ক্রমে উত্তোলিত বালুর ২৫ শতাংশ জমির মালিক (জমির ভাড়া বাবদ) এবং বাকী অংশ দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে এই উত্তোলিত বালু রাতের আঁধারে সম্প্রতি বিক্রি শুরু করেন মিনহাজ উদ্দিন, পাপন, সুমন এবং স্বপন মৃধাসহ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে গত ২৯ অক্টোবর বালু ব্যবসায়ীদের সাথে সমঝোতা করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত বালু বিক্রির জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেন।
প্রজ্ঞাপন ও বাস্তব চিত্র –
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, এক কোটি ৪০ লাখ ২৩ হাজার ৬৯১ ঘন ফুট বালু ৯৭ পয়সা ঘট ফুট দরে বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ জমির মালিক, ২০ শতাংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এবং কাজ না পেলেও বাকী ৪৫ শতাংশ বা ৭৭ লাখ ১৩ হাজার ৩১ ঘনফুট বালু গোড়াই বিসিক শিল্প নগরীতে ভরাটের জন্য ইসলাম খোকন কনস্ট্রাকশন এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের পরিচালক সাইফুলকে অনুমতি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়- আগামী ১২ নভেম্বরের মধ্যে ৯৭ পয়সা দরে সরকারি কোড-এ চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়ার দির্দেশ প্রদান করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নামে খোকন কনস্ট্রাকশন এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে বালু নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারি কমিশনারের (ভূমি) সহযোগিতায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ১১ থেকে ১৩ টাকা ঘনফুট দরে প্রতিদিন রাত আটটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত শতশত ট্রাক বালু বিক্রি করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোড়াই বিসিক শিল্প পার্কের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালে খোকন কনস্ট্রাকশন এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের স্বত্ত্বাধিকারী মো. মঈনুল ইসলাম খোকন নামের একজন মাটি ভরাটের কাজ পেয়েছিলেন। সে সময় পর্যাপ্ত না থাকার কারণে তিনি কাজটি সম্পন্ন করতে পারেননি। তবে যেটুকু করেছিলেন সেইটুকুই কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি সব হিসাব নিকাশ শেষ করে চলে গেছেন।
পরবর্তীতে সম্প্রতি মাটি ভরাটের জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেখানে খোকন কনস্ট্রাকশন এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড অংশ নিলেও তিনি কাজটি পাননি। কাজ পেয়েছেন মতিন নামের একজন। মূলত তিনিই এখন এই মাটি ভরাটের কাজ করবেন।
খোকন কনস্ট্রাকশনের পরিচালক খোকনের কথা –
খোকন কনস্ট্রাকশন এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের পরিচালক মো. মঈনুল ইসলাম খোকন বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানে সাইফুল ইসলাম নামের কোন ব্যক্তি নেই। আমি বিসিক শিল্প পার্কে কিছু মাটি ভরাটের কাজ করেছিলাম। পরবর্তীতে মাটি না পাওয়ায় পূর্বে সেটুকু কাজ করেছিলাম সেটুকু কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়ে আমার হিসাব নিকাশ শেষ করে দিয়ে চলে এসেছি। সম্প্রতি পুণরায় কর্তৃপক্ষ দরপত্র আহ্বান করলে সেখানে আমিও অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি কাজ পায়নি, কাজ পেয়েছেন মতিন নামের একজন।
তবে কিভাবে মাটি ফেলার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমাকে অনুমতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করলো তা জানি না। আমি এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি চিঠি দেব বিষয়টি জানার জন্য।
উপেজলা ও জেলা প্রশাসনের কথা –
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম জানান, বিসিক শিল্প পার্কে মাটি প্রয়োজন, তাই খোকন কনস্ট্রাকশন এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে নদী থেকে উত্তোলন করা সরকারি বালু ৯৭ পয়সা দরে সেখানে ভরাটের জন্য এবং বাকী অংশ জমির মালিক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে বিসিক শিল্প পার্কের নামে কেউ যদি মাটি বাইরে বিক্রি করে থাকে তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহবুব হোসেন জানান, বালু বিক্রির সাথে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয়টি কয়েকজনের কাছ থেকে জেনেছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।










