খবরবাংলা ডেস্ক :
প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বিয়ে করেছিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস। তবে বিয়ের পর স্বামীর আগের আরেকটি বিয়ের কথা জানতে পেরে তাঁদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর জেরে জান্নাতুলকে পরিকল্পিতভাবে নৌকায় ঘুরতে নিয়ে হত্যার পর হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বামী রাজা মিয়ার বিরুদ্ধে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটের তদন্তে এ হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মো. মুসলিম উদ্দিন ও শুক্কুর আহমদকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। তাঁদের মধ্যে মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিয়ের পর জানতে পারেন স্বামীর আগের বিয়ের কথা: পিবিআই সূত্রে জানা যায়, জান্নাতুল ফেরদৌসের বয়স ২৮ বছর। তিনি একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। তিন বছর আগে প্রথম স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন তিনি।
বিয়ের পর সাত বছর বয়সী মেয়ে তানিসাকে নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট সিগন্যাল এলাকায় রাজা মিয়ার সঙ্গে বসবাস করতেন জান্নাতুল। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে পিবিআইয়ের ভাষ্য। তিনি শপিং ব্যাগ তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করতেন।
একপর্যায়ে জান্নাতুল জানতে পারেন, রাজা মিয়া এর আগেও বিয়ে করেছিলেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এই বিরোধের জের ধরেই জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন রাজা মিয়া।
নৌকায় নিয়ে হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ: পিবিআই জানায়, জান্নাতুলকে হত্যার বিষয়ে রাজা মিয়া তাঁর পূর্বপরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরে তাঁরা কালুরঘাট ব্রিজ এলাকার এক কবিরাজের কাছে যান এবং ঝাড়ফুঁকসহ বিভিন্ন তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এতে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা মিয়া। সেখানে মুসলিম উদ্দিন, আরমান এবং রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুক্কুর আহমদ একটি স্যাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে জান্নাতুলকে নৌকায় তুলে কর্ণফুলী ব্রিজের নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
যেভাবে হত্যার ঘটনা ঘটে বলে দাবি পিবিআইয়ের: পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে জান্নাতুলের সঙ্গে রাজা মিয়ার বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রাজা মিয়া তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে শিকলবাহা খালে ফেলে দেন। এরপর রাজা মিয়া জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরেন এবং আরমান নামের আরেক ব্যক্তি রশি দিয়ে তাঁর গলা পেঁচিয়ে ধরেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এতে জান্নাতুলের মৃত্যু হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে। পরে রাজা মিয়া ও আরমান তাঁর হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে মরদেহ বস্তাবন্দি করেন। এরপর কর্ণফুলী থানার কালারপোল এলাকায় মরদেহ ফেলে তাঁরা পালিয়ে যান বলে অভিযোগ।
চার দিন পর উদ্ধার হয় বস্তাবন্দি মরদেহ: পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ঘটনার চার দিন পর, ২ আগস্ট, কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা খাল থেকে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জান্নাতুলের পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি শনাক্ত করেন।
ঘটনার পর রাজা মিয়ার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তাঁকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করে জান্নাতুলের পরিবার। পরে তাঁর মা ছায়রা খাতুন রাজা মিয়া ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় মামলা করেন।
দুজন গ্রেপ্তার, তদন্ত চলছে : পিবিআই কর্মকর্তা জানান, গত ৬ অক্টোবর মামলাটি সদরঘাট নৌ পুলিশ থেকে তদন্তের জন্য পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মো. মুসলিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্কুর আহমদকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
শুক্কুর আহমদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত স্যাম্পান নৌকাটি জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই। সংস্থাটির দাবি, মুসলিম উদ্দিন বুধবার আদালতে নিজের সম্পৃক্ততা ও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত এখনো চলছে এবং পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











