মো আজিজুল হক
,
নাগরপুর প্রতিনিধিঃ
লৌহজং নদীর তীরে গড়ে ওঠা টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম বাতিঘর সরকারি যদুনাথ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ১৯০০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি টানা ১২৬ বছর ধরে এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। শতবর্ষের গণ্ডি পেরিয়ে আজও প্রতিষ্ঠানটি নাগরপুর তথা টাঙ্গাইল জেলার অন্যতম প্রাচীন ও গৌরবময় বিদ্যাপীঠ হিসেবে নিজস্ব মর্যাদা ধরে রেখেছে।
প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে নাগরপুর অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য আধুনিক শিক্ষার দ্বার উন্মোচনের লক্ষ্যে ১৯০০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব বাবু যাদবলাল চৌধুরী, হরিলাল চৌধুরী ও কিশোরী চন্দ্র প্রামাণিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় বাঁশ ও ছন দিয়ে নির্মিত একটি অস্থায়ী ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাবু মুকুন্দলাল চক্রবর্তী (বি.এ.)।
তবে প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছরের মধ্যেই বিদ্যালয়টি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে নাগরপুরের বিশিষ্ট জমিদার রায় বাহাদুর সতীশচন্দ্র চৌধুরী বিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে সংকটমুক্ত করেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় কাকা যদুনাথ চৌধুরী-এর স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে বিদ্যালয়ের নামকরণ করেন ‘নাগরপুর যদুনাথ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়’। উল্লেখ্য, যদুনাথ চৌধুরী বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না; তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ নামকরণ করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারিত হলে প্রতিষ্ঠানটি ‘সরকারি যদুনাথ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিদ্যালয়টি শিক্ষার মান ও ফলাফলে বিশেষ সুনাম অর্জন করে। ১৯১১ সালে এই বিদ্যালয় থেকে প্রথম এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন কাটরিনীবাসী যোগেশ চন্দ্র নিয়োগী। তাঁর এই সাফল্যে আনন্দিত হয়ে রায় বাহাদুর সতীশচন্দ্র চৌধুরী তাঁকে সংবর্ধনা দিয়ে নাগরপুর প্রদক্ষিণ করান এবং পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান করেন। এই বিদ্যাপীঠের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক ও ভারতরত্ন ড. বিধানচন্দ্র রায়, ডা. ব্রজবল্লভ সাহা এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক গিরিজাশংকর রায়চৌধুরী-সহ বহু গুণী ব্যক্তিত্বের স্মৃতি।
প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ পথচলায় এসেছে নানা চড়াই-উতরাই। ১৯১৭ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বিক্রমপুরের শিক্ষাবিদ বাবু সুরেশচন্দ্র চ্যাটার্জি (এম.এ.)। পরবর্তীতে তিনি মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এরপর ১৯২১ সালে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র রমেশচন্দ্র চ্যাটার্জি (বি.এ.)। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। কিন্তু ১৯৩০ সালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিদ্যালয়ের মূল ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র পুড়ে যায়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠিত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষা কার্যক্রম আবারও স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়।বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১ হাজার ৩১৩ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এর মধ্যে ৮৬৩ জন ছাত্র এবং ৪৫০ জন ছাত্রী। শিক্ষার্থীদের পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন ৩৪ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা। এছাড়া প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করছেন ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ ঘোষিত হয়।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশরা আমিরা বলেন, “সরকারি যদুনাথ পাইলট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়তে পেরে আমি গর্বিত। এখানকার শিক্ষকরা শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার শিক্ষাও দেন। ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম আরও বৃদ্ধি পাক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জিহাদ হাসান বলেন, “১২৬ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। আধুনিক শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।”বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক রমেন্দ্র নারায়ণ শীল (বি.কম., বি.এড.) বলেন, “শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থা সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
সরকারি যদুনাথ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়, মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করে আসছে। ১৯৩০ সালের অগ্নিকাণ্ডসহ নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠানটি আজ ১২৬ বছরের গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী। এই ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্ব বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষকমণ্ডলীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই বিদ্যাপীঠ ভবিষ্যতেও তার সুনাম অক্ষুণ্ন রাখবে।”প্রতিষ্ঠানের (ভারপ্রাপ্ত )প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, “১২৬ বছরের গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের।
আমাদের কৃতি শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছেন। বর্তমানে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলির বিকাশে গুরুত্ব দিচ্ছি। সরকারি ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে আগামীতেও এই প্রতিষ্ঠান নাগরপুর তথা দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তার মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করবে।” দীর্ঘ চাকুরী জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি প্রতিষ্ঠানটির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও শুভকামনা করেন।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও এলাকাবাসীর মতে, সরকারি যদুনাথ পাইলট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি নাগরপুরের শিক্ষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। ১২৬ বছরের এই গৌরবময় বিদ্যাপীঠের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার মান আরও সমৃদ্ধ করতে সরকারি ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকবে এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।











