খবরবাংলা ডেস্ক :
অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাতে খবর প্রকাশিত হলেও, রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ খবর অস্বীকার করেছেন ইশরাক। তিনি দাবি করেছেন, পদত্যাগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাককে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা যায়। তবে রাত পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাক
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তাঁর ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে তাঁকে গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করতে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র ছিল।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া আইনসম্মত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ঘটনা নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বিএনপি ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় আপত্তি না থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এমন অভিযানে একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজে অস্ত্র হাতে অংশ নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারকেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।
আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র প্রদর্শনের দাবি ইশরাকের
সমালোচনার মুখে রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া বিবৃতিতে ইশরাক হোসেন দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মসূচিটি পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়েছিল।
ইশরাকের দাবি, গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। অভিযানের আগে মাদক কারবারিদের হামলার আশঙ্কার কথাও জানতে পারেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, ঘটনাস্থলের কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
ইশরাক আরও দাবি করেন, তাঁর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং আত্মরক্ষার জন্যই সেটি প্রদর্শন করা হয়েছিল। অভিযানে কয়েকটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন জব্দ এবং ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের কথাও জানান তিনি।
তবে এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা তদন্ত করছে ডিএমপি
ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, ঘটনার আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে বিষয়টি জানাননি। পরে তাঁরা ঘটনাটি জানতে পারেন। ইশরাকও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন।
পদত্যাগের নির্দেশের খবরকে গুজব বললেন ইশরাক
রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ইশরাক হোসেন দাবি করেন, তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর সঠিক নয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
সাংবাদিকদের জন্য খোলা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠানো অডিও বার্তায় ইশরাক এ খবরকে গুজব হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, দল বা সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে।
ফলে প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে এসেছে। এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
এর আগে পদত্যাগ করেন সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
এর আগে বিতর্কিত একটি ঘটনায় ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম আসার পর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজনের নাম আলোচনায় আসে। তবে মিষ্টি ওই ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।
ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা এবং পদত্যাগের নির্দেশ নিয়ে ওঠা বিতর্কের বিষয়ে এখন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের অপেক্ষা রয়েছে।
তথ্য সূত্র : প্রথম আলো










