খবর বাংলা ডেস্ক :
ফুটবল—বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পরিচিত খেলাগুলোর একটি। আফ্রিকার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক নগরসভ্যতা—ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে কোটি মানুষের আবেগকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে এই গোল চামড়ার বল। আর ফুটবলকে বৈশ্বিক উন্মাদনার শিখরে পৌঁছে দিয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ।
ফুটবলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীন চীনের ‘কুজু’ এবং মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের ‘মব ফুটবল’ থেকে ধীরে ধীরে আধুনিক ফুটবলের জন্ম। পরে ব্রিটিশদের হাত ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে খেলাটি। তবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে ওঠে ফিফা বিশ্বকাপ, যা এখন বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া আয়োজন।
যেভাবে শুরু বিশ্বকাপের যাত্রা বিশ শতকের শুরুর দিকে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলে অলিম্পিকের বাইরে শুধুমাত্র ফুটবলের জন্য আলাদা বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের উদ্যোগ নেয় ফিফা। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের প্রচেষ্টায় ১৯২৮ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ১৯৩০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে। সে সময় অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মাত্র ১৩টি দল অংশ নেয়। স্বাগতিক উরুগুয়ে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে, রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা।
যুদ্ধের কারণে বন্ধ, পরে নতুন সূচনা ১৯৩৪ সালে ইতালি ও ১৯৩৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ আয়োজনের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ বন্ধ থাকে। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে আবারও শুরু হয় ফুটবল মহাযজ্ঞ। তবে সেবার ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে স্বাগতিক ব্রাজিল।
পেলের উত্থানে বদলে যায় বিশ্ব ফুটবল ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে আবির্ভাব ঘটে কিংবদন্তি ফুটবলার পেলের। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সে ব্রাজিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। পরে ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালেও ব্রাজিলকে শিরোপা এনে দেন তিনি। তিনটি বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ফুটবলারদের একজন হয়ে ওঠেন পেলে।
ব্রাজিলের টানা সাফল্যের পর ‘জুলে রিমে ট্রফি’ স্থায়ীভাবে তাদের দখলে চলে যায়। পরে ফিফা নতুন ট্রফি চালু করে, যা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে।
ম্যারাডোনা, টিকি-টাকা ও আধুনিক ফুটবল ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে ফুটবলে কৌশলগত পরিবর্তন আসে। নেদারল্যান্ডসের ইয়োহান ক্রুইফ ‘টোটাল ফুটবল’ দর্শন জনপ্রিয় করেন। তবে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার পারফরম্যান্স ফুটবল ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেয়।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল ও মাঝমাঠ থেকে একাধিক খেলোয়াড় কাটিয়ে করা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ আজও বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত।
২০০২ সালে প্রথমবারের মতো এশিয়ায়—জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যৌথভাবে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেই আসরে ব্রাজিল রোনালদো ও রোনালদিনহোর নৈপুণ্যে পঞ্চমবারের মতো শিরোপা জেতে।
অন্যদিকে ২০১০ সালে স্পেন ‘টিকি-টাকা’ কৌশলে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায়। মেসির স্বপ্নপূরণ ও কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা আসর হিসেবে বিবেচিত হয়। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ম্যাচে টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা।
এর মাধ্যমে ৩৬ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেন লিওনেল মেসি। একই সঙ্গে তিনি ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার গোল্ডেন বল জয়ের রেকর্ড গড়েন।
বিশ্বকাপের উল্লেখযোগ্য রেকর্ড বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল, যারা পাঁচবার শিরোপা জিতেছে। জার্মানি ও ইতালি জিতেছে চারবার করে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা, তাঁর গোল সংখ্যা ১৬। আর এক আসরে সর্বোচ্চ ১৩ গোলের রেকর্ড এখনো ধরে রেখেছেন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন।
২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন যুগ
২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। এবারই প্রথম ৩২ দলের বদলে ৪৮টি দেশ অংশ নেবে। ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে হবে ১০৪টি।
নতুন ফরম্যাটের এই বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করছেন ক্রীড়াবিশ্লেষকরা।
তথ্য সূত্র : যমুনা টিভি











