খবরবাংলা
,
ডেস্ক
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু দেশের রাজনীতিতেই নয় ব্যক্তিগত জীবনেও রেখেছে গভীর শূন্যতা। এই শূন্যতার সবচেয়ে বড় নীরব সাক্ষী দীর্ঘদিনের পরিচারিকা ও বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী ফাতেমা বেগম বাংলাদেশের রাজনীতির টালমাটাল সময়, ক্ষমতার পালাবদল, কারাবাস ও দীর্ঘ অসুস্থতার অধ্যায়- সব সময়ই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন একজন নীরব, প্রচারবিমুখ মানুষ। তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতা নন, নন পরিবারের রক্তের আত্মীয়ও। তিনি ফাতেমা বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের গৃহকর্মী ও বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী। ক্ষমতার শীর্ষ সময় থেকে শুরু করে নিঃসঙ্গ কারাগার কিংবা হাসপাতালের চার দেয়ালে-খালেদা জিয়ার জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নীরবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন ফাতেমা। রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় যখন অনেক পরিচিত মুখ দূরে সরে গেছে, তখনো ফাতেমা ছিলেন অবিচল।
সাধারণ পরিবার থেকে ‘ফিরোজা’ পর্যন্ত পথচলা ফাতেমা বেগমের বাড়ি ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলায়। খুব সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে আসা এই নারী নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে খালেদা জিয়ার বাসভবনে কাজ শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন গৃহকর্মী নন, পরিবারের একজন সদস্যে পরিণত হন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’তেই কেটেছে তার জীবনের দীর্ঘ সময়।
খালেদা জিয়ার দুই ছেলে তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর অনুপস্থিতিতে ফাতেমাই ছিলেন তাঁর নিকটতম সঙ্গী। অসুস্থতা ও মানসিক চাপের সময়ে খালেদা জিয়ার দৈনন্দিন দেখভাল থেকে শুরু করে একাকিত্ব কাটানোর দায়িত্বও পালন করেছেন ফাতেমা।
স্বেচ্ছায় কারাগারে প্রবেশ –
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা ঘোষণার পর তাকে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। অসুস্থ ও বয়সের ভারে ন্যুব্জ খালেদা জিয়া তখন কার্যত একা। সেই সময় আদালতের বিশেষ অনুমতি নিয়ে কারাগারে তার সঙ্গে প্রবেশ করেন ফাতেমা বেগম। অপরাধী না হয়েও শুধু প্রিয় নেত্রীর সেবা করার জন্য স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন তিনি। দীর্ঘ সময় কারাগারে খালেদা জিয়ার একমাত্র সঙ্গী ছিলেন এই ফাতেমাই।
সংসারের টান উপেক্ষা করে দায়িত্ব-
ফাতেমা বেগমের নিজেরও পরিবারে রয়েছে স্বামী ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ছোট মেয়ে পড়াশোনা করছে। তবু নিজের সংসারের চেয়ে খালেদা জিয়ার পাশে থাকাকেই জীবনের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। পরিবারের সদস্যরাও এই ত্যাগ মেনে নিয়েছেন। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাকালে ফাতেমার স্বামী ও সন্তানেরা মাঝে মাঝে জেলগেটে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতেন।
ইতিহাসের নীরব চরিত্র-
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নাম গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তার জীবন ও রাজনীতির নানা দিক নিয়ে লেখা হবে বই, গবেষণা ও বিশ্লেষণ। সেই ইতিহাসের কোনো এক পাদটীকায় হয়তো উল্লেখ থাকবে ফাতেমা বেগমের নাম- একজন সাধারণ গৃহকর্মী, যিনি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে বিশ্বস্ততার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ফাতেমা রাজনীতির ভাষা জানেন না, ক্ষমতার হিসাবও বোঝেন না। তবে তিনি জানতেন, ‘ম্যাডাম’-এর পাশে থাকা তার দায়িত্ব। আর এই বোধই তাকে সাধারণ মানুষের গন্ডি ছাড়িয়ে অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।











