খবর বাংলা ডেস্ক :
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবির, সীমান্ত এলাকা এবং যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের অসামান্য সব ছবি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন ভারতের কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই। তার তোলা শরণার্থীদের দুর্দশা, অনাহার, ক্লান্তি এবং সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলা মানুষের হৃদয়বিদারক ছবিগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। পরবর্তীতে এসব ছবি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হয়।
রঘু রাইয়ের আলোকচিত্রে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রাম, স্বাধীনতার জন্য লড়াই, শরণার্থীদের অসহায়ত্ব, ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ এবং বিজয়ের আনন্দ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। তার প্রতিটি ফ্রেম যেন যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের একেকটি বাস্তব ইতিহাস।
দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি শুধু ছবি তোলেননি, বরং ইতিহাস, মানবিক বেদনা ও সময়ের সাক্ষ্য নথিবদ্ধ করেছেন ক্যামেরার মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের চিত্রপট জীবন্ত হয়ে মানুষের সামনে উঠে আসে এমন কিছু সাহসী আলোকচিত্রীর কাজের মাধ্যমে, যাদের একজন ছিলেন রঘু রাই।

জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে যুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন তিনি। প্রাণসংহারের আশঙ্কা থাকলেও তিনি তার কাজ থেকে সরে আসেননি। সেই সাহসিকতাই তাকে বিশ্বজুড়ে সম্মানিত করেছে।
কিংবদন্তি এই আলোকচিত্রী ১৯৪২ সালের ডিসেম্বর মাসে অবিভক্ত ভারতের ঝাং শহরে জন্মগ্রহণ করেন, যা বর্তমানে পাকিস্তানের অংশ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তার পরিবার ভারতের দিল্লিতে চলে আসে। তবে জন্মভূমির স্মৃতি তিনি কখনো ভুলে যাননি।
জীবনের শুরুতে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করলেও মাত্র ২৩ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ফটোগ্রাফির জগতে প্রবেশ করেন। সেই শুরু থেকেই তার প্রতিভা তাকে দ্রুত আন্তর্জাতিক খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়।
১৯৬৬ সালে তিনি আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে দি স্টেটসম্যান পত্রিকায় যোগ দেন এবং ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আলোকচিত্র ধারণ করেন।
তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়া ১৯৯২ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে প্রকাশিত ‘ভারতের বন্যপ্রাণীর মানব ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রতিবেদনের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ‘বর্ষসেরা ফটোগ্রাফার’ পুরস্কার লাভ করেন।
রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় উঠে এসেছে ইন্দিরা গান্ধী, দালাই লামা, মাদার তেরেসার মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বের ছবি। পাশাপাশি ভারতের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক বাস্তবতার অসংখ্য অনন্য মুহূর্তও তিনি ধারণ করেছেন।
শনিবার (২৬ এপ্রিল) দিল্লিতে ৮৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি আলোকচিত্রী। তার মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
রঘু রাইয়ের মৃত্যু হলেও তার ক্যামেরায় ধরা ইতিহাস, বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা, চিরকাল বেঁচে থাকবে ইতিহাসের পাতায়।











