বিশেষ প্রতিনিধি:
দেশের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে বড় শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবন নির্মাণে স্থাপত্য, কাঠামোগত ও বৈদ্যুতিক পরিকল্পনাকে সমন্বিত করে অনুমোদন এবং নির্মাণ শেষে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
এ কথা জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। তিনি বলেন, নগর ও আবাসন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে এরই মধ্যে বেশ কিছু কাজ শুরু হয়েছে। এখন চেষ্টা করা হচ্ছে আর্কিটেকচার, স্ট্রাকচারাল এবং ইলেক্ট্রো প্ল্যানিং—সবকিছু সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার আওতায় আনার।
তিনি বলেন, কোনো ভবনের নকশা অনুমোদনের পর সেটি নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট ডিজাইনারদের মাধ্যমে ভবনটি অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে কি না, তা প্রত্যয়ন করার ব্যবস্থা করা হবে।
জাকারিয়া তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় গত সাত মাস ধরে নগর উন্নয়ন ও আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু কাজ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের দেওয়া প্রস্তাবগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী , আরবান ডেভেলপমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইউডিডি) প্রথমবারের মতো ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের কাজ করা হবে। শুরুতে মেট্রোপলিটন শহরগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরপর বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকার জন্য বাস্তবভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রতিটি এলাকার প্রয়োজন ও সম্ভাবনা বিবেচনা করে কোথায় কী ধরনের স্থাপনা, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা কিংবা অন্যান্য ব্যবহার হবে—তা নির্ধারণ করে জোনিং করা হবে বলেও জানান তিনি।
তার ভাষায়, মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেকটা একটি লক্ষ্যবস্তুতে চারটি তীর ছোড়ার মতো। কোনো একটি হয়তো লক্ষ্যে লাগতে পারে। কিন্তু পরিকল্পিত উন্নয়নের ক্ষেত্রে এভাবে এগোনোর সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতেই কাজ করতে হবে। এ কারণেই ইউডিডিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি এ বিভাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সঠিক পরিকল্পনার জন্য পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের সর্বশেষ জনশুমারি অনেক আগের। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি, জনসংখ্যা, বসতি, আবাসন ও নগরায়ণের প্রকৃত চিত্র জানতে নতুন করে একটি উপযুক্ত শুমারি করা প্রয়োজন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে।
ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজধানীর ধানমন্ডিসহ রাজউক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় রাজউকের মাধ্যমে ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে অনেক এলাকায় অনুমোদিত পরিকল্পনা ছাড়াই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ভবন চিহ্নিত করার কাজ চলছে।
রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিল এলাকার পরিবেশ নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ছয়বার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলেও জানান জাকারিয়া তাহের।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, গুলশান, বনানী ও বারিধারায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি বাড়িঘর রয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাড়িতে নির্মাণের সময় যে সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল থাকার কথা ছিল, তা করা হয়নি। একইভাবে অনেক নামিদামি ডেভেলপার ভবন নির্মাণ করলেও বর্জ্য পরিশোধনের জন্য স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপির ব্যবস্থা করেননি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার পাশাপাশি গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটির সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব বৈঠকে রাজউক চেয়ারম্যান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নিয়েছেন।
জাকারিয়া তাহের বলেন, গুলশান ও বারিধারার মতো এলাকাগুলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষায়িত এলাকা। এসব এলাকার লেকের পানি ও পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব না হলে সারাদেশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা আরও কঠিন হবে।
তিনি বলেন, নগর উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ রয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনাও পাওয়া যাচ্ছে। জনগণ থেকে নির্বাচিত সরকার দেশের কল্যাণে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর কোনো পরামর্শ পেলে তা গ্রহণে আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
নগর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে নতুন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠনের কথাও জানান জাকারিয়া তাহের। তিনি বলেন, রাজউকের আদলে গত সাত মাসে ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও বরিশালে নতুন ছয়টি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগে আরও চারটি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ছিল। পর্যায়ক্রমে বগুড়াসহ অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, কোনো এলাকায় ডেভেলপমেন্ট অথরিটি না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকেই নকশা অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও এর উদাহরণ রয়েছে। বসিলাসহ কিছু এলাকায় ইউনিয়ন পর্যায় থেকে ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এসব বিষয়কে একটি সামগ্রিক আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদিত নকশা ছাড়া নির্মিত ভবন কিংবা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত স্থাপনার বিষয়েও নতুন বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে বলে জানান তিনি। আগামী এক মাসের মধ্যে সেটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। বিধিমালা অনুমোদিত হলে ভবন নির্মাণ ও তদারকির আইন আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জাকারিয়া তাহের বলেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ব্যাপকভাবে আবাসন নিশ্চিত করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে ৩০ বছর মেয়াদি মর্টগেজ সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থা ছাড়া বৃহৎ পরিসরে আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন।
এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত এগিয়ে এলে সরকার সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।
বেসরকারি আবাসন খাতের নীতিমালা নিয়েও পরিবর্তন আনার কথা বলেন জাকারিয়া তাহের। তিনি জানান, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন নীতিমালা করা হয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিকল্পনা ও শর্তের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। আগের কাজ যথাযথভাবে হয়েছে কি না, তার ওপরও পরবর্তী পরিকল্পনা অনুমোদনের বিষয়টি নির্ভর করবে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধে বেসরকারি আবাসন খাতকেও আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ঢাকার বাসযোগ্যতা প্রসঙ্গে জাকারিয়া তাহের বলেন, বাসযোগ্যতার দিক থেকে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। ফলে রাজধানীকে বাসযোগ্য করতে সরকারকে একসঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। তবে অতিরিক্ত জনঘনত্বের কারণে কাজটি সহজ নয়। যথাযথ পরিকল্পনার পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া এ উদ্যোগ সফল করা কঠিন।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, গত ৫ অক্টোবর বসতি দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীও বাংলাদেশের আবাসন বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে।
জাকারিয়া তাহের বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জনবান্ধব আবাসন নীতি বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণও জরুরি। মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনে সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখলে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।











