খবরবাংলা ডেস্ক :
নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। শরতের স্নিগ্ধ বাতাসে মাঠজুড়ে দুলছে ধানের চারা। নদীর তীরে ফুটে থাকা কাশফুল আর প্রকৃতির এই আবহ জানান দিচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা।
দেবী দুর্গার আগমন ঘিরে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন নড়াইলের পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা। খড় ও মাটির কাজ শেষ করে কেউ ব্যস্ত প্রতিমায় রং-তুলির আঁচড় দিতে, আবার কেউ মাটির প্রলেপ দিয়ে রং করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রোববার (৪ অক্টোবর) নড়াইল সদর উপজেলার কয়েকটি মন্দির ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন মণ্ডপে চলছে প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ। কোথাও চলছে কাদামাটির প্রলেপ, আবার কোথাও প্রতিমার অবয়বে ফুটে উঠছে রং-তুলির নান্দনিক ছোঁয়া। এরপর সাজসজ্জা ও অলংকারে পূর্ণতা পাবে দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য প্রতিমা।
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে শুধু নড়াইলের শিল্পীরাই নন, বিভিন্ন জেলা থেকেও মৃৎশিল্পীরা এসেছেন প্রতিমা তৈরির কাজে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদের ব্যস্ততা।
তবে ব্যস্ততার সঙ্গে বাড়ছে না আয়—এমনটাই জানিয়েছেন কয়েকজন প্রতিমাশিল্পী। তাদের ভাষ্য, মাটি, খড়, রং ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও। কিন্তু সে অনুযায়ী প্রতিমা তৈরির পারিশ্রমিক বাড়েনি। ফলে পরিশ্রম ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় লাভ কমে যাচ্ছে।
নড়াইল টাউন কালীবাড়ি দুর্গামন্দিরে খুলনা থেকে এসে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন শিল্পী দেবদাস সরদার। ছোটবেলা থেকেই কাদামাটি ও রং-তুলির সঙ্গে তাঁর সখ্য। এবার নড়াইলের তিনটি মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।
দেবদাস সরদার জানান, প্রতিমার নিখুঁত কাজ ও নান্দনিকতার ওপর ভিত্তি করে তাঁর পারিশ্রমিক তুলনামূলক বেশি। প্রতিটি প্রতিমা তিনি আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা চুক্তিতে তৈরি করছেন। তবে মাটি, খড়, রং, অন্যান্য উপকরণ ও সহযোগীদের পারিশ্রমিক বাদ দিলে খুব বেশি লাভ থাকে না।
তিনি বলেন, লাভ কমে যাওয়ায় অনেকেই ধীরে ধীরে প্রতিমা তৈরির পেশা থেকে সরে যাচ্ছেন।
নড়াইল সর্বজনীন মন্দিরে প্রতিমা নির্মাণ করছেন শিল্পী উজ্জ্বল পাল। এ বছর পাঁচটি মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তিনি।
উজ্জ্বল পাল বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার প্রতিমার সাজসজ্জার উপকরণের দাম বেড়েছে। কিছু বিশেষ ধরনের রং দেশের বাজারে পাওয়া যায় না, ভারত থেকে আনতে হয়। ফলে উপকরণ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে প্রতিমা তৈরিতে খরচ বেড়েছে।
বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত উজ্জ্বল বলেন, শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তিনি এখনো এই কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিমার আকার ও সৌন্দর্য অনুযায়ী একেকটি প্রতিমার জন্য ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নেওয়া হচ্ছে।
আয়োজকরা জানান, এ বছর প্রতিমা নির্মাণে খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। প্রতিমার আকার ও সৌন্দর্য অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি মণ্ডপের বাইরের সাজসজ্জা ও নিরাপত্তা প্রস্তুতিও চলছে।
নড়াইল কেন্দ্রীয় টাউন কালীবাড়ি দুর্গামন্দিরের সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার কুণ্ডু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে আসছে। এবারও উৎসব সাড়ম্বরে আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিমাশিল্পীদের পারিশ্রমিকও বেশি দিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর নড়াইল জেলায় ৫৪৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৪৯টি, কালিয়া উপজেলায় ১৪৪টি এবং লোহাগড়া উপজেলায় ১৫০টি মণ্ডপ রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ১৯টি।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট পংকজ বিহারী ঘোষ বলেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মন্দিরে গিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।
শরতের প্রকৃতি যেমন উৎসবের আগমনী বার্তা দিচ্ছে, তেমনি শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততায় দিন-রাত এক করে প্রতিমা গড়ছেন মৃৎশিল্পীরা। তবে উপকরণ ও শ্রমের ব্যয় বাড়লেও তাদের আয়-রোজগার নিয়ে রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











