খবরবাংলা ডেস্ক :
সাধারণ ফ্যানের পরিবর্তে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ব্রাশলেস ডাইরেক্ট কারেন্ট (বিএলডিসি) ফ্যানের ব্যবহার বাড়ানো গেলে গ্রীষ্মকালে দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এতে বছরে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ এড়ানো সম্ভব বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (২ নভেম্বর) প্রকাশিত ‘হাউসহোল্ড স্পেস কুলিং ইন বাংলাদেশ: রোল অব এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ফ্যানস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহারের সম্ভাবনা ও এ খাতে সরকারের করণীয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সংস্থাটির বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মকালে বাসাবাড়িতে ফ্যান ব্যবহারের কারণে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা তৈরি হয় ৫ হাজার ২১২ মেগাওয়াট। রাত ৯টার দিকে ফ্যানের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি থাকে। অথচ দেশে ব্যবহৃত মোট ফ্যানের মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ বিএলডিসি প্রযুক্তির।
সাধারণ ফ্যান চালাতে যেখানে ৭০ ওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, সেখানে বিএলডিসি ফ্যানে লাগে মাত্র ৩৫ ওয়াট।
দেশের ২৬ জেলার ৪৩৫টি পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান সম্পর্কে অধিকাংশ পরিবারের ধারণা নেই। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৫ শতাংশ পরিবার বাজারে এ ধরনের ফ্যান পাওয়া যায়, সে বিষয়েই অবগত নয়। তবে এসব ফ্যান ব্যবহারে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়টি জানার পর ৯৬ শতাংশ পরিবার বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় আবাসিক খাতে। এ খাতে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার বিদ্যুতের চাহিদা বাড়াচ্ছে। স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোও গ্রীষ্মকালে দুটি পর্যন্ত ফ্যান ব্যবহার করে। ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারায় অনেক সময় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়।
আইইইএফএর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) জন্য চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে এবং বিপিডিবির ওপর চাপও কমবে।
গবেষণা অনুযায়ী, বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারের মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৭৩ কোটি ডলার বা ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট কমানো গেলে ভবিষ্যতে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না।
তবে সাধারণ ফ্যানের তুলনায় বিএলডিসি ফ্যানের দাম বেশি হওয়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এটি কেনা কঠিন। একটি সাধারণ ফ্যানের দাম প্রায় ২ হাজার টাকা। অন্যদিকে বিএলডিসি ফ্যানের দাম ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা।
দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকা বা তার কম। এসব পরিবারের গ্রীষ্মকালীন গড় মাসিক বিদ্যুৎ বিল ৬৬৩ টাকা। আর্থিক সহায়তা ছাড়া শুধু বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের মাধ্যমে বিএলডিসি ফ্যানের বাড়তি দাম পুষিয়ে নিতে এসব পরিবারের ৭ দশমিক ৭ থেকে ৯ দশমিক ৬ বছর সময় লাগতে পারে।
তবে বড় পরিসরে একসঙ্গে ফ্যান কেনা এবং কার্বন ক্রেডিট বিক্রির অর্থ ব্যবহার করা গেলে এ সময় কমে ৪ দশমিক ৮ বছরে নেমে আসতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়াতে সাতটি সুপারিশ করেছে আইইইএফএ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহারে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ফ্যানের মান নির্ধারণ ও লেবেলিং নির্দেশিকা চূড়ান্ত করা, বড় পরিসরে ফ্যান কেনার উদ্যোগ, স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য সহজ অর্থায়ন, কর্মসূচি বাস্তবায়নে সুপার এনার্জি সার্ভিস কোম্পানি (ইএসসিও) গঠন এবং ফ্যানের মান নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) ফ্যানের মান নির্ধারণ ও লেবেলিং নির্দেশিকা চূড়ান্ত করা জরুরি। এতে ক্রেতারা সহজেই বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান শনাক্ত করতে পারবেন। পাশাপাশি সরকার বড় পরিসরে ফ্যান কেনার মাধ্যমে দাম কমাতে পারে। স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে কিস্তিতে ফ্যানের দাম পরিশোধের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সংকট বাড়ছে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার চাপ কমিয়ে দ্রুত স্বস্তি দিতে পারে, এমন উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়ানো তেমনই একটি উদ্যোগ। এসব ফ্যান ব্যবহার শুরু হলেই বিদ্যুতের চাহিদা কমতে শুরু করবে।











