খবরবাংলা ডেস্ক :
গ্যাসের সংকট, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির কারণে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) চলতি অর্থবছরে এ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের প্রাক্কলন করেছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি থাকায় বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোর ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। সম্প্রতি এসব কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর আর্থিক চাপও তীব্র হচ্ছে।
এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে ব্যয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক চাপের বড় কারণ হয়ে উঠেছে এলএনজির উচ্চমূল্য। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন এবং কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেটের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের শুরুতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা হলেও সেপ্টেম্বরে দাম বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে পৌঁছেছে। এতে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসে এলএনজি খাতে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য এ খাতে বরাদ্দ ছিল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে আরও ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, যুদ্ধের প্রভাবে গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া গত আড়াই মাসে এলএনজির জন্য প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাও কয়েক গুণ বাড়তে পারে।
জ্বালানি তেলে বড় লোকসান বিপিসির জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পরও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান পুরোপুরি কমেনি। গত সাড়ে ছয় মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, গত সাড়ে ছয় মাসে সংস্থাটির মাসিক গড় লোকসান হয়েছে প্রায় তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া, প্রিমিয়ামসহ আমদানি ব্যয় বেড়েছে। সরবরাহ পেতেও আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের তথ্য অনুযায়ী, বছরে বাংলাদেশকে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ৪৫ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম লিটারপ্রতি প্রায় ২০৫ টাকা।
বাড়তে পারে সরকারের আর্থিক চাপ জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে উৎপাদন ব্যয় ও ভর্তুকির পরিমাণও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকি—দুটিই বাড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার বাড়ায় এ খাতেও ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে।
দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে পরিবহন ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এতে ডিজেলের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির ওপর চাপও কমানো সম্ভব বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান ও সরকারি ভর্তুকির চাপ পূর্বনির্ধারিত হিসাব ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











