নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাকা সেতু। অথচ সেই সেতুতে ওঠার নিরাপদ পথ নেই। বাধ্য হয়ে বাঁশ কাঠের নড়বড়ে সিঁড়ি পেরিয়ে সেতুতে উঠে নদী পার হচ্ছেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার থিরোপাড়ার পাঁচ ইউনিয়নের হাজারো মানুষ। একটু অসতর্ক হলেই নদীতে পড়ে গিয়ে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। আর শিক্ষার্থী, রোগী ও বয়স্কদের জন্য প্রতিদিনের এই পারাপার হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ।
যদিও সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস এলজিইডি ও উপজেলা প্রশাসনের। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে পদ্মার শাখা হুগলি নদীর থিরোপাড়া এলাকায় সেতু নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় এলজিইডি। ৯০ মিটার সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ২০২১ সালে সেতুটি নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০২৬ সালে। প্রকল্পের আওতায় ৯০ মিটার সেতুর পাশাপাশি প্রায় ২৮০ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কথা রয়েছে। এদিকে সেতু নির্মাণ শেষে উত্তর পাশের সড়কের কাজ শেষ হলেও দক্ষিণ পাশের অংশটি জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতায় আটকে আছে। বিকল্প নিরাপদ পথ না থাকায় স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে অস্থায়ী সিঁড়ি তৈরি করেছেন। দীর্ঘদিন ব্যবহারে সেটিও এখন জরাজীর্ণ। প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়ে শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী, বয়স্ক মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চলাচল করছেন।
‘জমি অধিগ্রহণ জটিলতা সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেতুর নড়িয়া অংশের সংযোগ সড়ক সম্পন্ন করা হয়নি। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীসহ আমি সেখানে গিয়ে পরিদর্শন করেছি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের পথ খুঁজে বের করেছি। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই সেতুটির সংযোগ সড়কের কাজ সম্পন্ন করে সেতুটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে।’ স্থানীয়দের অভিযোগ, মাচাটি দুলতে থাকায় পারাপারের সময় সবসময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে রোগী নিয়ে চলাচল এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে তাদের ভোগান্তি বেশি। সেতুর সংযোগ সড়ক দ্রুত নির্মাণ করে এটি পুরোপুরি চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা। সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর এক প্রান্তে পাকা সড়ক থাকলেও অন্য প্রান্তে শেষ হয়েছে পথ। সেতুতে উঠতে হলে স্থানীয়দের তৈরি বাঁশ-কাঠের সরু সিঁড়ি একমাত্র ভরসা।
সিঁড়িটির কোনো কোনো অংশ নড়বড়ে হয়ে গেছে, কোথাও আবার কাঠের পাটাতনও ক্ষয়ে গেছে। একজনের পর আরেকজন সতর্কভাবে পা ফেলছেন। শিশু ও বয়স্করা পার হচ্ছেন স্বজনদের সহযোগিতা নিয়ে। নিচে নদীর পানি থাকায় সামান্য ভুলেই বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা যায়। সিঁড়ি দিয়ে শুধু মানুষ নয়, কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামালও পারাপার করা হচ্ছে। এতে বাড়ছে দুর্ভোগ ও ঝুঁকি। জরুরি রোগী নিয়ে কেউ এ পথে গেলে স্বজনদের থাকতে হচ্ছে বাড়তি দুশ্চিন্তায়। বকাউল কান্দি এলাকার পক্ষাঘাতগ্রস্ত কৃষক খোকন গাজি এই পথ দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করেন। পায়ের সমস্যার কারণে নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে সেতুতে ওঠা তার জন্য আরও কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হয় যেকোনো মুহূর্তে ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা তার।
‘এই সেতুর কাজ অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে একপাশের সংযোগ সড়ক জমি-সংক্রান্ত জটিলতায় সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। আমরা সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছি, এখন তারা সংযোগ সড়কের জন্য জমি দিতে রাজি হয়েছে। সেক্ষেত্রে ডিজাইনে কিছু পরিবর্তন এনে দ্রুত সময়ের মধ্যেই কাজটি সম্পন্ন করা হবে।’ খোকন গাজি বলেন, পায়ে সমস্যা থাকায় এই সিঁড়ি দিয়ে পার হতে আমার খুব ভয় লাগে। এটি নড়বড়ে, কখন যে পা পিছলে নিচে পড়ে যাই, সেই ভয় থাকে। প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয়। সেতুর সঙ্গে রাস্তা হয়ে গেলে আমাদের এই কষ্ট আর থাকবে না। এই ঝুঁকিপূর্ণ সিঁড়ি দিয়েই প্রতিদিন মাদরাসায় যাতায়াত করে ভাই-বোন নাহিদ ও জুঁই। তাদের চলাচলের একমাত্র বাহন সাইকেল। সেতুতে ওঠার পথ না থাকায় দুই ভাই-বোনকে মিলে সাইকেলটি ধরাধরি করে সেতু পার হতে হয়। নাহিদ বলেন, আমরা প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে মাদরাসায় যাই। কিন্তু সাইকেল নিয়ে সেতু পার হওয়া খুব কষ্টের। দুজন মিলে অনেক কষ্ট করে সাইকেলটা তুলে সেতুতে ওঠাই। সেতুর সঙ্গে রাস্তা হয়ে গেলে আমাদের আর এভাবে কষ্ট করে মাদরাসায় যেতে হবে না। ‘শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন অনেক কষ্ট করে এই পথ দিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকায় তাদের সিঁড়ি দিয়ে সেতুতে উঠে নদী পার হতে হয়। অনেক সময় হেঁটে আসতে গিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দেরি হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সিঁড়িটি নড়বড়ে হওয়ায় যেকোনো সময় শিক্ষার্থীরা পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।
আমরা চাই, দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করে সেতুটি পুরোপুরি চালু করা হোক। স্থানীয় স্কুল শিক্ষিকা গীতা রানি রায় বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন অনেক কষ্ট করে এই পথ দিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকায় তাদের সিঁড়ি দিয়ে সেতুতে উঠে নদী পার হতে হয়। অনেক সময় হেঁটে আসতে গিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দেরি হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সিঁড়িটি নড়বড়ে হওয়ায় যেকোনো সময় শিক্ষার্থীরা পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। আমরা চাই, দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করে সেতুটি পুরোপুরি চালু করা হোক। এ ব্যাপারে নড়িয়া উপজেলা প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, এই সেতুর কাজ অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে একপাশের সংযোগ সড়ক জমি-সংক্রান্ত জটিলতায় সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
আমরা সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছি, এখন তারা সংযোগ সড়কের জন্য জমি দিতে রাজি হয়েছে। সেক্ষেত্রে ডিজাইনে কিছু পরিবর্তন এনে দ্রুত সময়ের মধ্যেই কাজটি সম্পন্ন করা হবে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেতুর নড়িয়া অংশের সংযোগ সড়ক সম্পন্ন করা হয়নি। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীসহ আমি সেখানে গিয়ে পরিদর্শন করেছি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের পথ খুঁজে বের করেছি। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই সেতুটির সংযোগ সড়কের কাজ সম্পন্ন করে সেতুটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে।











