খবর বাংলা ডেস্ক :
স্বামী অস্ট্রেলিয়ায়, স্ত্রী দেশে—অথবা স্ত্রী অস্ট্রেলিয়ায়, স্বামী দেশে। মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর এমন বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাতে হচ্ছে অসংখ্য প্রবাসী পরিবারকে। অস্ট্রেলিয়ার পার্টনার ভিসা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এখন শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং হাজারো পরিবারের জন্য এক গভীর মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
ভিসা আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ বিলম্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হলেও অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনমন্ত্রী টনি বার্ক সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নাকচ করেছেন। তিনি বলেছেন, অভিবাসন সংখ্যা কম দেখানোর উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভিসা আবেদন আটকে রাখা হচ্ছে না।
রোববার (১৪ জুন) স্কাই নিউজের ‘সানডে এজেন্ডা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টনি বার্ক জানান, কিছু ক্ষেত্রে পার্টনার ভিসা পেতে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগছে। তবে এর জন্য সরকারের কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত দায়ী নয়। প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনবল সংকটের কারণেই এ বিলম্ব হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সম্প্রতি স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পার্টনার ভিসার অপেক্ষমাণ আবেদন সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে আরও প্রায় ৬০ হাজার নতুন আবেদন যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রতিবছরই বাড়ছে আবেদনজট এবং দীর্ঘ হচ্ছে অপেক্ষার সময়।
এ পরিস্থিতিতে সমালোচকদের অভিযোগ, নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন কমিয়ে দেখানোর লক্ষ্যে সরকার ভিসা প্রক্রিয়ার গতি কমিয়েছে। তবে সরকার এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার মাইগ্রেশন আইন ১৯৫৮ অনুযায়ী পার্টনার ভিসা ‘ডিমান্ড-ড্রিভেন’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ আবেদনকারীর সংখ্যা অনুযায়ী এসব আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। ফলে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে।
সাবেক অভিবাসন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক ড. আবুল রিজভি বলেন, যদি প্রমাণিত হয় যে ইচ্ছাকৃতভাবে আবেদন প্রক্রিয়া ধীর করা হয়েছে, তাহলে তা আইনি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আদালত সরকারকে মাইগ্রেশন আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেনি।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পার্টনার ভিসার মধ্যে অনশোর সাবক্লাস ৮২০/৮০১ এবং অফশোর সাবক্লাস ৩০৯/১০০ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। সাধারণত আবেদনকারীরা প্রথমে অস্থায়ী ভিসা পান এবং পরে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ লাভ করেন।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, অনেক আবেদনকারীকে বর্তমানে ১২ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এ সময় আরও দীর্ঘ হচ্ছে। এই ভিসার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা এবং যোগ্য নিউজিল্যান্ডের নাগরিকরা তাদের জীবনসঙ্গীকে অস্ট্রেলিয়ায় আনতে পারেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে দম্পতিদের মধ্যে মানসিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অনেক পরিবারের সন্তানের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও আটকে যাচ্ছে ভিসা জটের কারণে।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার নথির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে এসব কাগজপত্র সংগ্রহে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা ভোগান্তি আরও বাড়াচ্ছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা-পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন আবেদনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় পারিবারিক পুনর্মিলনভিত্তিক ভিসা প্রক্রিয়ায় জট আরও প্রকট হয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতাদের ভাষ্য, পার্টনার ভিসা শুধু একটি অভিবাসন প্রক্রিয়া নয়; এটি পরিবারকে একত্রে রাখার স্বপ্ন। তাই দীর্ঘদিন ধরে চলা এ ভিসাজট নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











