খবরবাংলা ডেস্ক :
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফর শুধু একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ৬ থেকে ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত এই সফরের মাধ্যমে ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করার বার্তা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি, তখন ভারত নিজেকে কেবল আঞ্চলিক অংশীদার নয়, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম নীতিনির্ধারক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
ইন্দো-প্যাসিফিকে ভারতের নতুন কৌশল সফরকালে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সামুদ্রিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে আলোচনা হয়। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে কৃষি, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই তিনটি সফরের মাধ্যমে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু ভারত-কেন্দ্রিক নয়; বরং পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নতুন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অবস্থানের প্রশ্নও জড়িত।
বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি উত্তরণের পথে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে শুধু অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধার ওপর নির্ভর করে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে না। আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন হবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ ভারত বর্তমানে নিকেল, তামা ও বিরল খনিজের মতো কৌশলগত সম্পদের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, যা ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক যান, সেমিকন্ডাক্টর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ সরাসরি এসব খনিজের মালিক না হলেও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক ভ্যালু চেইনের অংশ হয়ে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বঙ্গোপসাগরের বাড়তি গুরুত্ব দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্থল সীমান্ত, নদীর পানি বণ্টন ও যোগাযোগকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও এখন কৌশলগত গুরুত্ব দ্রুত বঙ্গোপসাগরের দিকে সরে যাচ্ছে। ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বন্দর উন্নয়ন এবং নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করার উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলা, ব্লু ইকোনমি, সামুদ্রিক গবেষণা, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
জলবায়ু ও প্রযুক্তিতে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় এবং উপকূল ক্ষয়ের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির গুরুত্ব বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি হলেও পরিবর্তিত ইন্দো-প্যাসিফিক বাস্তবতায় নিষ্ক্রিয় থাকা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হবে না। বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ, সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠন, নতুন প্রযুক্তিগত জোট এবং অর্থনৈতিক একীকরণের নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রসম্পদ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের ইন্দো-প্যাসিফিক শুধু ভূগোল দিয়ে নয়, বরং কার্যকর নীতি, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।











