খবরবাংলা ডেস্ক :
দেশজুড়ে হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠা বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকট, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া, গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহের ঘাটতির পাশাপাশি সংকটের পেছনে রাজনৈতিক ‘স্যাবোটাজ’ রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহের বৈশ্বিক সংকটের পাশাপাশি পতিত আওয়ামী লীগের সমর্থক ও সুবিধাভোগী বিভিন্ন মহলের তৎপরতাও বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। প্রতিবেদনে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর নামও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড়ে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছেছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এই ব্যবধানকে বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া নিয়ে চাপ বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে দেশের বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকরা সরকারের কাছে তাদের বকেয়া অর্থ পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানিয়েছেন, বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হলে বর্তমানে সংরক্ষিত তেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
তাঁর দাবি, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। তবে নতুন করে তেল আমদানি করতে হলে বিদেশ থেকে তা আনতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে অনুমোদিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ৫০টির বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে গেলে জাতীয় গ্রিডে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রকৌশলী মনির হোসেন বলেন, তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো মহল যাতে ভিন্ন উদ্দেশ্যে তৎপর হতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন ব্যাখ্যা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও ভিন্ন মত রয়েছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দুর্বল হয়েছে।
অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে গত দেড় দশকের জ্বালানি নীতি ও আমদানিনির্ভরতাকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, ২০১০ সাল থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া হলে বর্তমান সংকট মোকাবিলা সহজ হতো।
ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করতে একটি চক্র ষড়যন্ত্র করছে বলে সরকারের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দাবি করেছেন, বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনাও একটি ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু তখন বিদ্যুৎ অফিস বা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে মিটার ভাঙচুর ও বিদ্যুৎকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাকে তিনি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি, সরবরাহ ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া ও দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে রাজনৈতিক স্যাবোটাজের এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। সংকটের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের তথ্য যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।











