খবর বাংলা ডেস্ক :
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি বাণিজ্যচুক্তিকে কেন্দ্র করে দেশে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের একাংশের দাবি, গোপনে সম্পাদিত এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পখাত এবং নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য নীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ শুক্রবার রাজধানীতে এক সমাবেশে বলেন, এই চুক্তি দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে ফেলবে। তিনি জাতীয় সংসদে আলোচনা করে চুক্তিটি বাতিলের দাবি জানান।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন, এই চুক্তি দেশের জ্বালানি আমদানির জন্য বড় ধরনের বাধা তৈরি করতে পারে। তার মতে, এতে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ও যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শুরুতে চুক্তির শর্ত গোপন রাখা হলেও পরে তা প্রকাশিত হলে নানা অসামঞ্জস্য সামনে আসে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিচ্ছে, বিপরীতে বাংলাদেশ পাচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে সুবিধা।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির ফলে বাংলাদেশ সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধাপে ধাপে শুল্ক কমানো হলে সরকারের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব কমে যেতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে সুবিধা দিচ্ছে, তার বাস্তব রপ্তানি সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের জন্য খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, জ্বালানি খাত, টেলিযোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ মার্কিন কৃষিপণ্য, এলএনজি ও বিমান কেনার বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে অন্য দেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যচুক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় এবং প্রযুক্তি খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাণিজ্যচুক্তির নামে বাংলাদেশকে কার্যত কঠোর শর্তের মধ্যে ফেলা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা হতে পারে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, চুক্তিটি অত্যন্ত বৈষম্যমূলক এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য হুমকি। তার মতে, নির্বাচিত সরকারের উচিত চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করা।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, চুক্তি কার্যকর করার আগে সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ পর্যালোচনা করা জরুরি। তা না হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিল্প, কৃষি এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











