ঘাটাইল সংবাদ দাতা
টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরসহ জেলার বিভিন্ন বনাঞ্চল ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রায় ৫০০ করাতকল, যার মধ্যে ৩ শতাধিকই অবৈধ। এসব করাতকলে প্রতিদিন বনভূমির কাঠ চেরাই করে ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করা হচ্ছে। এতে দ্রুত কমে যাচ্ছে বনাঞ্চলের গাছপালা, আর অনেক জায়গায় বনভূমি রূপ নিচ্ছে কৃষিজমিতে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট বনভূমির পরিমাণ ১ লাখ ২২ হাজার ৮৭৬ একর। এই বনাঞ্চল ঘিরে বর্তমানে ৪৭০টি করাতকল রয়েছে, যার মধ্যে ৩০৭টির কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। অবৈধ করাতকলগুলোতে বনজ কাঠ চেরাই করে নিয়মিত বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধুপুর বনাঞ্চল। প্রায় ৪৫ হাজার একর বনভূমির মধ্যে ৩৫ হাজার একর ইতোমধ্যে বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে। সেখানে এখন আনারস, কলা, ড্রাগনসহ বিভিন্ন কৃষি ফসলের চাষ হচ্ছে। বাকি ১০ হাজার একর বনাঞ্চলও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একই অবস্থা ঘাটাইল ও সখীপুরের বনাঞ্চলেও। বনভূমির ভেতর ও আশপাশে গড়ে ওঠা করাতকলগুলো প্রতিনিয়ত বনজ সম্পদ ধ্বংস করছে।
বন বিভাগের হিসাবে, মধুপুর উপজেলায় ৯০টি করাতকলের মধ্যে ৭৩টির লাইসেন্স নেই। সখীপুরে রয়েছে ৪২টি অবৈধ করাতকল এবং ঘাটাইলে ৭৭টির মধ্যে ৫৯টির নিবন্ধন নেই। বেশিরভাগ করাতকলই বনাঞ্চলের আশপাশে গড়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের অসাধু কিছু কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অবৈধ করাতকল মালিকদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে সহায়তা করছেন। এর ফলে প্রতিদিন বনাঞ্চলের কাঠ চেরাই হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে।
এদিকে অবৈধ করাতকল মালিকদের দাবি, তারা লাইসেন্সের জন্য একাধিকবার আবেদন করেও অনুমোদন পাচ্ছেন না। মধুপুর পৌর শহরের এক করাতকল মালিক জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও ভূমির প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহে জটিলতার কারণে তারা লাইসেন্স পাননি। ফলে বাধ্য হয়েই লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা চালাতে হচ্ছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, করাতকল বিধিমালা ২০১২ অনুযায়ী সংরক্ষিত বনভূমির ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন নিষিদ্ধ। এই বিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুবই সীমিত। পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-র বিভাগীয় সমন্বয়কারী গৌতম চন্দ্র চন্দ বলেন, অবৈধ করাতকল দ্রুত উচ্ছেদ না করা হলে টাঙ্গাইলের বনাঞ্চল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।
মধুপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত আঞ্জুম পিয়া জানিয়েছেন, অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। সম্প্রতি চারটি অবৈধ করাতকল মালিককে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলেন, করাতকল স্থাপনের জন্য নির্ধারিত নিয়ম মেনে আবেদন করতে হয় এবং বনাঞ্চল থেকে অন্তত ১০ কিলোমিটার দূরে হতে হয়। তিনি জানান, অবৈধ করাতকল উচ্ছেদে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং সম্প্রতি ১৬টি করাতকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বন রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ না বাড়ালে টাঙ্গাইলের বনভূমি আরও দ্রুত উজাড় হয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।











