টাঙ্গাইল সদর সংবাদ দাতা
টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর বিস্তীর্ণ তীরজুড়ে এখন সূর্যমুখীর সোনালি আভা। ধু ধু বালুচর আর বেলে-দোআঁশ জমি যেখানে একসময় প্রায় অনাবাদি পড়ে থাকত, সেখানে এখন দিগন্তজোড়া বড় বড় থালার মতো সূর্যমুখী ফুল বাতাসে দুলছে। ভোরের আলো যখন ফুলের ওপর পড়ে, তখন চারপাশে সৃষ্টি হয় এক মায়াবী সৌন্দর্য।
ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে সূর্যের প্রথম আলো পড়তেই যমুনা নদীর বাম তীরের টাঙ্গাইল অংশে ঝলমল করে ওঠে সূর্যমুখীর সোনালি হাসি। সবুজ পাতার আড়াল ভেদ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলগুলো যেন সূর্যের দিকে তাকিয়ে নতুন দিনকে স্বাগত জানায়। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের পাশাপাশি কৃষকদের মনেও জাগিয়েছে নতুন স্বপ্ন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় মোট ১৭৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪৫ হেক্টর, বাসাইলে ৪৬ হেক্টর, কালিহাতীতে ৮ হেক্টর, ঘাটাইলে ১০ হেক্টর, নাগরপুরে ১০ হেক্টর, মির্জাপুরে ১০ হেক্টর, মধুপুরে ১৪ হেক্টর, ভূঞাপুরে ৫ হেক্টর, গোপালপুরে ৫ হেক্টর, সখীপুরে ৩ হেক্টর, দেলদুয়ারে ২০ হেক্টর এবং ধনবাড়ী উপজেলায় ২ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ৮ থেকে ১০ হেক্টর বেশি জমিতে এই ফসলের চাষ হয়েছে।
এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতার কারণে জেলার চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় সূর্যমুখীর বাম্পার ফলন হয়েছে। আগে যেখানে সখের বশে কিছু জমিতে সূর্যমুখী লাগানো হতো, এখন তা বাণিজ্যিক চাষাবাদের মর্যাদা পেয়েছে। দিগন্তজোড়া হলুদ ফুল দেখতে ছাত্র-ছাত্রী, পর্যটক ও নানা বয়সী দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। একই সঙ্গে কৃষকরাও লাভের হিসাব কষতে শুরু করেছেন।
সরেজমিনে যমুনা তীরবর্তী এলাকায় দেখা যায়, যেখানে আগে শুধু বালুচর চোখে পড়ত সেখানে এখন সূর্যমুখীর হলুদ সমারোহ। কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন ফুলের পরিচর্যায়। হেমন্তে লাগানো সূর্যমুখী সাধারণত বসন্তে পরিপক্ক হয়। এখন অনেক ক্ষেতের ফুল পূর্ণতা পেয়েছে এবং কয়েকদিনের মধ্যেই বীজ সংগ্রহ শুরু হবে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সূর্যমুখী চাষে খরচ ও পরিশ্রম তুলনামূলক কম কিন্তু লাভ বেশ ভালো। প্রতি বিঘা জমিতে চাষ করতে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। ভালো ফলন হলে বিঘা প্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বীজ বিক্রি করা সম্ভব। এছাড়া সূর্যমুখীর খৈল মাছ ও পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবেও কাজে লাগে।
স্থানীয় কৃষক নাজিমুদ্দিন, আবুল কালাম, নাজমুল ইসলাম, খবির উদ্দিন ও আব্দুর রহমান জানান, যমুনা তীরের বেলে মাটিতে আগে বাদাম, তিল বা তিশি চাষ হলেও উৎপাদন কম হতো। কিন্তু সূর্যমুখী চাষে খরচ কম এবং ফলন ভালো হওয়ায় তারা এই ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। সদর উপজেলার কৃষক ফরমান আলী ও বোরহান তালুকদার বলেন, আগে এসব জমিতে তেমন কোনো ফসল হতো না। এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে সূর্যমুখী লাগিয়েছেন এবং ফলন ভালো হওয়ায় তারা আশাবাদী।
কৃষিবিদদের মতে, বাংলাদেশে সূর্যমুখী চাষের প্রধান সময় রবি মৌসুম। সুনিষ্কাশিত বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি এ চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। দেশে সাধারণত বারি সূর্যমুখী-২, বারি সূর্যমুখী-৩, হাইসান-৩৩ (হাইব্রিড) এবং ডিএস-১ জাতের চাষ হয়ে থাকে। বারি সূর্যমুখী-২ জাতের গাছে সাধারণত ৪২ থেকে ৪৪ শতাংশ তেল থাকে।
পুষ্টিবিদদের মতে, সূর্যমুখীর তেল হৃদরোগীদের জন্য উপকারী এবং এতে কোলেস্টেরলের মাত্রা কম। বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সূর্যমুখী তেলের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে টাঙ্গাইলের এই আবাদ স্থানীয় ভোজ্যতেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ দুলাল উদ্দিন জানান, সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে সরকার বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে কৃষকদের এই অর্থকরী ফসল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। যমুনার পলিবিধৌত উর্বর মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ফলনও হয়েছে আশাতীত। তিনি মনে করেন, সূর্যমুখী চাষ কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।











