খবরবাংলা ডেস্ক :
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মাধ্যমে চুল্লিপাত্র প্রথমবারের মতো ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করেছে, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় তা পিছিয়ে যায়। গত সপ্তাহে উচ্চ চাপে দুই দফায় ভালভের পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। পরীক্ষার ফলাফল যাচাইয়ের পর গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) অনুমোদন পাওয়া যায়।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান প্রথম আলোকে বলেন, তিন দিনের প্রস্তুতির পর শনিবার পারমাণবিক বিক্রিয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়। রোববার সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাঁর মতে, এটি দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি বড় মাইলফলক।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথে রূপপুর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হওয়াকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে বিক্রিয়া শুরু হওয়া মানেই বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়া নয়। এর পরও বেশ কয়েকটি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।
কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদিত কমিশনিং কর্মসূচি অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে রিঅ্যাক্টর ফিজিকস পরীক্ষা, নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই, ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় গ্রিডে সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা চালানো হবে। প্রতিটি ধাপ অনুমোদিত পদ্ধতি ও নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে চুল্লির শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ানো হবে। উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হবে, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করবে।
প্রথম ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা নির্ধারিত পর্যায়ে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণ হলে ডিসেম্বরেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় ও উৎপাদনক্ষমতা
পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ একক উন্নয়ন প্রকল্প। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। আর কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)।
রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুই ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রকল্পের সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী, এর মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
দেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন একটি উৎস যুক্ত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন্দ্রটি থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ সক্ষমতা বাড়বে এবং জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য আসবে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে কমিশনিং, নিরাপত্তা যাচাই ও গ্রিড সংযোগের সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে তা বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির জন্য একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
তথ্য সূত্র : প্রথম আলো










