অলক কুমার :
ঝড়-তুফানে বুক পেতে যে আগলে রাখলো ঘর, রোদ উঠতেই আজ সে মানুষ হুট করে হলো পর!
যাদের ঘামে উঠলো গড়ে শক্ত মাটির ভিত, ফাগুন আসতেই গাইছে তারা অন্য সুরে গীত।
উড়ে এসে জুড়ে বসা পরজীবীদের ভিড়, শিকড় কেটে খাচ্ছে তারা, নাড়াচ্ছে আজ নীড়।
আসল মালি আড়াল করে নকল ফুলের সাজ, এভাবে কি টিকবে বেশি মেকি সুখের রাজ?– এভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অবহেলা আর বঞ্ছনার কষ্ট তুলে ধরছেন বিগত আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়া নেতাকর্মীরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের সাথে যুক্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন পোস্ট, স্ট্যাটাস ও লাইভে উঠে এসেছে বঞ্চনার অভিযোগ। যেখানে বলা হচ্ছে – দল ক্ষমতায় আসার পর প্রকৃত ত্যাগীদের পরিবর্তে সুবিধাভোগীরা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন।
ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক পেইজে প্রকাশিত পোস্টে দেখা যায়, অনেক ত্যাগী নেতা তাদের বঞ্চনার অভিযোগ করছেন। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ততা, জেল-জুলুম, মামলা-হামলার শিকার, পঙ্গুত্ববরণসহ ভূমিকা রাখলেও মূল্যায়নের সময় তারাই বেশি উপেক্ষিত হচ্ছেন।
নেতাকর্মীদের কষ্টের কথা –
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়া অনেক পোস্টে দেখা যায়, তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা লিখছেন, “রাজপথে যারা ছিলাম, আজ তারা উপেক্ষিত” এ ধরনের বক্তব্যে সহমত জানিয়ে অসংখ্য মন্তব্য করছেন অন্য নেতাকর্মীরাও। কেউ কেউ সরাসরি অভিযোগ করছেন, দলে নতুন করে অনুপ্রবেশকারীরা গুরুত্বপূর্ণ পদ ও সুযোগ পাচ্ছেন।
অনেক নেতাকর্মী লিখছেন, “রাজপথে জীবনবাজি রেখে আন্দোলন করেছি, অথচ আজ আমরাই অবহেলিত।” অনেকেই দাবি করছেন, দলের দুঃসময়ে মামলা-হামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ত্যাগী নেতাদের এখন আর মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
অন্যদিকে, বেশ কিছু আলোচিত ফেসবুক পোস্টে সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়েছে যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বা পূর্বে সক্রিয় থাকা ব্যক্তিরাই এখন বিভিন্নভাবে সুবিধা ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন। এতে করে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। একাধিক পোস্টে লেখা হয়েছে, “যাদের বিরুদ্ধে এতদিন আন্দোলন করেছি, আজ তারাই পুরস্কৃত – এটা মেনে নেওয়া কঠিন।”
একাধিক পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, “দলের দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলেন, তারা এখন তালিকার বাইরে।” তাদের বক্তব্য- দলে এখন হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের মূল্যায়ন বেশি হচ্ছে। বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকার ও এর নেতাকর্মীদের দ্বারা বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলসহ জাতীয়তাবাদী আদর্শের নেতাকর্মীরা নির্যাতিত হলেও এখন তাদেরই পূণর্বাসন চলছে বলে অনেকে সরাসরি অভিযোগ করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছবি, ভিডিও প্রকাশ করেছেন তারা।
অন্যদিকে, বেশ কিছু পোস্টে অভিযোগ উঠেছে যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর সাবেক বা বিতর্কিত নেতাদেরও বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে ত্যাগী বিএনপি নেতাদের মধ্যে। একজন নেতা তার পোস্টে লিখেছেন, “যাদের বিরুদ্ধে এতদিন লড়েছি, আজ তারাই মূল্যায়িত – এটা আমাদের জন্য লজ্জার।”
ফেসবুকের বিভিন্ন রাজনৈতিক গ্রুপ ও পেজে এ সংক্রান্ত আলোচনা এখন ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। অনেকেই বলছেন, দুঃসময়ে যারা মামলা-হামলা সহ্য করেছেন, কারাভোগ করেছেন, তাদের মূল্যায়ন না হওয়া দলের জন্য অশনিসংকেত। কিছু পোস্টে আবার দলের ভেতরে ‘গ্রুপিং’ ও ‘লবিং’-এর অভিযোগও তোলা হয়েছে।
৫ আগস্টের পরের –
আবার অনেকে অভিযোগ করেছেন যে, ৫ আগস্টের পর বিএনপির কিছু পদধারী নেতাকর্মী ব্যাপক চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত হয়ে যায়। আর সরকার গঠনের পর তারাই বিভিন্ন দপ্তর নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন শ্রমিক ও মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ বালু মহল পরিচালনা, জমি বিক্রি সিন্ডিকেট, টেন্ডারবাজী করছে। যা সরাসরি কিছু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে পরিচানা করা হচ্ছে। সে সকল ক্ষেত্রে ত্যাগী ও প্রতিবাদকারী নেতাকর্মীদের উপর নেমে আসছে অপপ্রচার ও বহিস্কারের খরগ।
অনেকে মন্তব্য করছেন, “দলের এই অবস্থান চলতে থাকলে ত্যাগীদের মনোবল ভেঙে পড়বে।” কেউ কেউ আবার দলের অভ্যন্তরে ‘অনুপ্রবেশ’ ও ‘সুযোগসন্ধানীদের দৌরাত্ম্য’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত –
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় আসার পর দলীয় কাঠামো পুনর্গঠন, পদ বণ্টন ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ ধরনের অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ দলীয় শৃঙ্খলার জন্য নেতিবাচক বার্তা দেয়।
এদিকে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং শিগগিরই অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই ক্ষোভ দ্রুত নিরসন করা না গেলে তা ভবিষ্যতে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
এটি শুধু টাঙ্গাইল জেলার চিত্র নয়। এই চিত্র সারা বাংলাদেশের। লাখ লাখ ত্যাগী, নির্যাতিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত জাতীয়তাবাদী আদর্শের নেতাকর্মীরা তাদের অবহেলা ও বঞ্চনার কথা কাউকে বলতে না পেরে প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজের আইডিতে পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন।











