মির্জাপুর প্রতিনিধি :
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌদিতে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর ও ছবি ছড়িয়ে পড়লে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের একটি পরিবারে নেমে আসে চরম উৎকণ্ঠা। ছড়িয়ে পড়া ছবির ওই নারীকে নিজেদের মেয়ে সুইটি আক্তার বলে দাবি করছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তবে সুইটি আক্তার ওই ঘটনায় জড়িত কি না, কিংবা তিনি বর্তমানে জীবিত আছেন কি না- এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
মেয়ের কোনো খোঁজ না পেয়ে মা জহুরা বেগমের চোখে এখন শুধু অশ্রু। মেয়ের ছবি বুকে জড়িয়ে কখনো কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি, আবার কখনো আশায় বুক বাঁধছেন- হয়তো মেয়ে বেঁচে আছেন, একদিন ফিরে আসবেন। অন্যদিকে বাবা ফজলু মিয়া নির্বাক হয়ে অপেক্ষা করছেন মেয়ের খবরের জন্য।
ওই পরিবার যা জানায় –
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিইটি আক্তার টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী চরপাড়া গ্রামের ফজলু মিয়ার ছোট মেয়ে। দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদের পর ২০২৩ সালে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান তিনি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে চাকরির কথা বলে তাঁকে সৌদি পাঠানো হয় বলে দাবি পরিবারের। এ জন্য নতু মিয়া নামে এক দালালকে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন স্বজনরা।
সৌদি আরবে যাওয়ার পর মক্কায় আল মাজাল আল আরবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন সুইটি। পরিবারের দাবি, সেখানে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর তিনি গ্রেপ্তার হন। তবে গ্রেপ্তারের বিষয়টি পরিবার জানতে পারে প্রায় এক বছর পর। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সুইটি নিজেই পরিবারকে তাঁর আটকের কথা জানিয়েছিলেন।
পরিবারকে সিইটি জানিয়েছিলেন, মারামারির একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সৌদি আরবে থাকা সিইটির এক বান্ধবী পরে পরিবারকে জানান, এক বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এরপর থেকেই মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল পরিবারের। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর ও ছবি ছড়িয়ে পড়লে সেই উৎকণ্ঠা রীতিমতো আতঙ্কে পরিণত হয়।
সুইটির বাবা ফজলু মিয়া বলেন, “গত ১৩ অক্টোবর সকালে মেয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছে। তখন সে বলেছিল, আড়াই মাসের মধ্যে দেশে ফিরবে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি ও খবর দেখে আমরা খুব ভয় পাচ্ছি। মেয়েটা বেঁচে আছে কি না, সেটাও জানি না।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা জহুরা বেগম বলেন, “আমার মেয়ে যদি বেঁচে থাকে, তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেন। আর যদি কোনো অঘটন ঘটে থাকে, তাহলে অন্তত সত্যিটা আমাদের জানান। মেয়ের কী হয়েছে—এই চিন্তায় আমরা ঘুমাতে পারছি না।”
পরিবারের সদস্যদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবির সত্যতা যাচাই করে দ্রুত সুইটি আক্তারের বর্তমান অবস্থান ও পরিস্থিতি নিশ্চিত করা হোক। তিনি জীবিত থাকলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা সাজা হয়ে থাকলে সে সম্পর্কেও পরিবারকে সরকারি তথ্য জানানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
প্রশাসনের বক্তব্য –
মির্জাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সিইটি আক্তার ওই ঘটনায় জড়িত কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং প্রকৃত ঘটনা যাচাইয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান চলছে।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলম বলেন, “এ বিষয়ে অফিসিয়ালি এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য খোঁজ নেওয়া হবে।”
এদিকে সুইটির পরিবার এখন একটি নিশ্চিত খবরের অপেক্ষায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা গুজব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁদের একটাই প্রশ্ন—সুইটি কি বেঁচে আছেন? নাকি প্রিয় মেয়েকে হারানোর খবরই অপেক্ষা করছে পরিবারটির জন্য? সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে এখন সরকারি ও কূটনৈতিকভাবে দ্রুত তথ্য যাচাইয়ের অপেক্ষায় স্বজনরা।










