ঘাটাইল সংবাদ দাতা
ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামীণ কাঁচা রাস্তার পাশে শুরু হয় তাওহীদ ইসলামের নতুন দিনের লড়াই। জন্ম থেকেই তাঁর দুটি হাত নেই। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা আর দারিদ্র্য কোনো কিছুই তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। পা দিয়েই কলম ধরে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দিগড় ইউনিয়নের গারট্র উত্তরপাড়া (খুশিপাড়া) গ্রামের এই অদম্য তরুণ।
মো. ফজলুল হক ও রত্না খাতুনের সন্তান তাওহীদের শৈশব কেটেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। সমবয়সীরা যখন হাত দিয়ে বই-খাতা নিয়ে পড়াশোনা করত, তখন তাঁকে পায়ের আঙুলের সাহায্যে কলম ধরার কৌশল আয়ত্ত করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম চেপে ধরে লেখার কারণে অনেক সময় ক্ষতও হয়েছে। তবু থেমে যাননি তিনি।
অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রমের ফলও পেয়েছেন তাওহীদ। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ ৪ দশমিক ৩৮ অর্জন করেছেন তিনি। বর্তমানে ঐতিহাসিক করটিয়া সা’দত কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক সম্মান প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
তাওহীদের স্বপ্ন খুব সাধারণ—পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং একটি সরকারি চাকরি পাওয়া। তাঁর ভাষায়, দুটি হাত না থাকলেও বেঁচে থাকার তাগিদে পা দিয়েই সব কাজ করেন। পড়াশোনা শেষ করে একটি সরকারি চাকরি পেলে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারবেন—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
তাওহীদের বাবা মো. ফজলুল হক বলেন, ছেলের জন্মের সময় দুই হাত না থাকায় তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। একসময় মনে হয়েছিল, ছেলে হয়তো সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে। কিন্তু পা দিয়ে লিখে ভালো ফল করে তাওহীদ সেই ধারণা বদলে দিয়েছেন। ছেলের সাফল্যে তিনি গর্বিত হলেও পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
মা রত্না খাতুন বলেন, ছোটবেলা থেকেই ছেলের কষ্ট নিজের চোখে দেখেছেন। অন্য শিশুরা যখন খেলত, তাওহীদ তখন পা দিয়ে লেখার অনুশীলন করতেন। লেখার চাপে পা ফুলে গেলেও তিনি থামতেন না। ছেলের জন্য দয়া নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ চান তিনি।
এলাকাবাসীরাও তাওহীদের সংগ্রাম ও সাফল্যে গর্বিত। তাঁদের মতে, দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও পা দিয়ে লিখে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত। তাঁর মতো মেধাবী ও সংগ্রামী তরুণের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তা সমাজের জন্যও ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করবে।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা যে স্বপ্নপূরণের পথে চূড়ান্ত বাধা নয়, তাওহীদ ইসলাম যেন তারই জীবন্ত উদাহরণ। এখন তাঁর প্রয়োজন দয়া নয়—প্রয়োজন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ, কর্মসংস্থানের পথ এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণের একটি সমান সুযোগ।











