খবরবাংলা ডেস্ক :
প্রকৃতির নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রে মানুষের হস্তক্ষেপ যে কখনো কখনো ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তার এক বিস্ময়কর উদাহরণ জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপ। বিষাক্ত ‘হাবু’ সাপের উপদ্রব কমাতে ১৯৭৯ সালে দ্বীপটিতে মাত্র ৩০টি ছোট ভারতীয় বেজি ছেড়েছিল জাপান। উদ্দেশ্য ছিল সহজ—প্রাকৃতিক শিকারি হিসেবে বেজি সাপের সংখ্যা কমাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা।
বেজি ছাড়ার পরিকল্পনায় বড় ভুল ছিল সাপ ও বেজির জীবনযাত্রার পার্থক্য বিবেচনা না করা। বেজি মূলত দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে। অন্যদিকে হাবু সাপ নিশাচর। ফলে দিনের বেলায় বেজিরা খাবার খুঁজলেও সাপ থাকত গর্তে বা আশ্রয়ে। আর রাতে সাপ যখন শিকারে বের হতো, তখন বেজি থাকত বিশ্রামে। ফলে বিষধর সাপের ওপর বেজির শিকারি হিসেবে কোনো কার্যকর প্রভাবই পড়েনি।
বরং দ্বীপে প্রাকৃতিক শত্রুর অভাব এবং পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ায় বেজির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সাপ শিকার করতে না পেরে তারা দ্বীপের বিরল স্থানীয় প্রাণীদের ওপর হামলা শুরু করে। এর মধ্যে ছিল বিরল ‘আমামি খরগোশ’, পাখি, সরীসৃপ ও উভচর। একপর্যায়ে দ্বীপের অন্তত সাতটি স্থানীয় প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে।
৩০টি থেকে ১০ হাজার! ২০০০ সালের দিকে আমামি ওশিমায় বেজির সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছে যায় বলে গবেষণায় উঠে আসে। অর্থাৎ সাপের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য আনা মাত্র কয়েক ডজন প্রাণীই শেষ পর্যন্ত দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে ১৯৯৩ সালে স্থানীয়ভাবে এবং ২০০০ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ে বেজি নির্মূল অভিযান শুরু করে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়। প্রায় ৭১২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপজুড়ে বসানো হয় হাজার হাজার ফাঁদ ও সেন্সর ক্যামেরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠন করা হয় বিশেষ দল—‘আমামি মঙ্গুস বাস্টার্স’।
দীর্ঘ অভিযানে প্রায় ৩২ হাজার ৬০০ বেজি ধরা হয়। ২০১৮ সালের এপ্রিলে সর্বশেষ একটি বেজি ধরা পড়ার পরও কর্তৃপক্ষ অভিযান থামায়নি। আরও ছয় বছর ধরে চালানো হয় নিবিড় পর্যবেক্ষণ।
অবশেষে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আমামি ওশিমাকে বেজিমুক্ত ঘোষণা করে। পরিবেশবিদদের কাছে এটি আক্রমণাত্মক শিকারি প্রাণী নিয়ন্ত্রণে এক বিরল সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই গল্পে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম আমামি ওশিমার এই দীর্ঘ পরিবেশগত সংকটের সঙ্গে বাংলাদেশেরও একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯১০ সালে বাংলাদেশ থেকে ছোট ভারতীয় বেজি প্রথম জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ওকিনাওয়া থেকে ১৯৭৯ সালে অন্তত ৩০টি বেজি আমামি ওশিমায় নিয়ে যাওয়া হয়। গবেষকেরা ঐতিহাসিক তথ্য ও ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ওকিনাওয়া এবং সেখান থেকে আমামি ওশিমা পর্যন্ত বেজির এই দীর্ঘ ভৌগোলিক যাত্রার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন।
তবে এই ঘটনায় বেজিকে দোষী করার সুযোগ নেই। তারা জানত না তাদের সাপ শিকার করতে হবে। মানুষই তাদের এক পরিবেশ থেকে অন্য পরিবেশে নিয়ে গিয়েছিল। নতুন পরিবেশে গিয়ে বেঁচে থাকার জন্য তারা নিজেদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুযায়ী শিকার করেছে।
আমামি ওশিমার ঘটনা তাই শুধু একটি দ্বীপ থেকে বেজি নির্মূলের গল্প নয়; এটি মানুষের ভুল পরিবেশগত সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতি এবং বাস্তুতন্ত্রের সূক্ষ্ম ভারসাম্য সম্পর্কে একটি বড় শিক্ষা।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











