খবরবাংলা ডেস্ক :
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিমান হামলা এবং দেশটির অপরিশোধিত তেল বিক্রির ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় বুধবার ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের অপরিশোধিত তেল বিক্রির জন্য পূর্বে দেওয়া সাধারণ লাইসেন্স বাতিল করে আবারও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে ওয়াশিংটন।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় রাত ১টা ২৮ মিনিটে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৩৮ ডলার বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ৫৪ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৩৭ ডলার বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭১ দশমিক ৮১ ডলারে ওঠে। এর আগের দিন মঙ্গলবারও দুই ধরনের তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জ্বালানি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মারকির গবেষণা প্রধান সল কাভোনিক বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল এখনো অনিশ্চিত। এতদিন বাজারে ধারণা ছিল বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং দাম আরও কমবে। কিন্তু নতুন সংঘাত সেই প্রত্যাশাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে তেলের দাম কমবে—এমন ধারণায় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এখন অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন।
তার মতে, উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবার সংঘাত শুরুর আগের পর্যায়ে নেমে এসেছিল। তখন ব্যবসায়ীদের ধারণা ছিল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল আবার বাজারে ফিরবে। তবে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই প্রত্যাশা আবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার দায় এখনো কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে কাতার এ ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। হামলার শিকার জাহাজগুলোর একটি ছিল কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী ট্যাংকার। জাহাজটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি ড্রোনের আঘাতে ইঞ্জিন কক্ষে আগুন লেগেছিল।
এদিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওমান উপকূলের কাছে সৌদি আরবের পতাকাবাহী একটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি সুপারট্যাংকার ‘ওয়েদিয়ান’। তবে কী কারণে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। বর্তমানে ইরান জাহাজগুলোকে ওমানের দিকের পথ এড়িয়ে নিজেদের উপকূলঘেঁষা নৌপথ ব্যবহার করতে নির্দেশ দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, আন্তর্জাতিক এই নৌপথ সব দেশের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
এদিকে বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহেও যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুদ কমেছে। রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকদের ধারণা, ৩ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুদ প্রায় ২৪ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে, যা বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











