ধনবাড়ী সংবাদ দাতা
টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী হাটে একসময় ছিল বাঁশের তৈরি নানা পণ্যের জমজমাট বেচাকেনা। এখনও সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে হাটে অর্ধশতাধিক পরিবার বাঁশের পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তবে প্লাস্টিকের পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার, বাঁশের দাম বৃদ্ধি ও ক্রেতার চাহিদা কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন সংকটের মুখে।
ধনবাড়ী বাজারে প্রতি সোমবার বাঁশের পণ্যের হাট বসে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রেতারা এখানে ডুলি, মাছ ধরার চাই, কুলা, চালুনি, খাঁচা, ঝাড়ু, ডালি ও পলোসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসেন। শীত মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়লেও বর্তমানে আগের তুলনায় বিক্রি অনেক কমেছে।
ভাইঘাট গ্রামের চান মিয়া (৫০) প্রায় ১০ বছর ধরে বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঁশের পণ্য পাইকারি কিনে এনে ধনবাড়ী হাটে বিক্রি করছেন। প্রতিবার ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করে তার লাভ হয় প্রায় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। এই আয় দিয়েই স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে তিন সদস্যের সংসার চালান তিনি।
চান মিয়া জানান, ট্রাক্টর দুর্ঘটনায় তার ডান পা ভেঙে যাওয়ার পর এই ব্যবসাই তার একমাত্র আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে পণ্যের বিক্রি কম থাকায় সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। সরকারি সহায়তা পেলে কিছুটা স্বচ্ছলভাবে চলতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করে তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
ক্রেতারাও বলছেন, বাঁশের পণ্যের সরবরাহ ও ব্যবহার দুটোই কমে যাচ্ছে। ধনবাড়ীর আজাহার আলী (৪০) জানান, বাড়ির ধানের ডুলি ভেঙে যাওয়ায় নতুন ডুলি ও মাটি কাটার ডালি কিনতে হাটে এসেছেন। তার মতে, গ্রামাঞ্চলের মানুষ বাঁশের পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্ত হলেও এখন প্লাস্টিকের পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা কমছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় এসব পণ্য বাজার থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
ধনবাড়ী হাটে বর্তমানে মাটি কাটার ডালি ৭০ থেকে ৯০ টাকা, বড় ডালি ৮০ থেকে ১৫০ টাকা, ঝাড়ু ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কুলা ৮০ থেকে ১৫০ টাকা, চালুনি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, মুরগির খাঁচা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, কবুতরের খাঁচা ১২০ থেকে ১৮০ টাকা, মাছ ধরার পলো ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং মাছ ধরার ডাইর ২০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতা ও ব্যবসায়ী আকবর হোসেন (৬৫) জানান, তিনি হাট থেকে বাঁশের পণ্য কিনে গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। প্রতি হাটে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার পণ্য কিনে সেগুলো বিক্রি করে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা লাভ করেন। তবে প্লাস্টিকের পণ্যের কারণে বাঁশের সামগ্রীর চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যবসা করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
বাঁশের পণ্য তৈরির কারিগর হযরত আলী (৪৮) বলেন, একসময় গ্রামের বাড়িতে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করা হতো। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এই কাজে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তৈরি পণ্যের চাহিদা কমেছে। ফলে অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
ধনবাড়ী হাটের ইজারাদার রশিদ জানান, আগে হাটে বাঁশের পণ্যের ২০ থেকে ৩০টি দোকান বসত। বর্তমানে তা কমে ৬ থেকে ৭টিতে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিকের পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে বাঁশের পণ্যের বিক্রি আগের মতো নেই।
স্থানীয় কারিগর ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাঁশশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা, কারিগরদের জন্য সহজ শর্তে আর্থিক সহযোগিতা এবং বাঁশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। তা না হলে ধনবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।











