টাঙ্গাইল সদর সংবাদ দাতা
প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে ব্যবসার ধরন বদলে গেছে। হিসাবের খাতা জায়গা ছেড়েছে কম্পিউটার, সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সিস্টেমকে। তবুও বাঙালির ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘হালখাতা’ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। টাঙ্গাইলের কিছু পুরোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও খাতা প্রস্তুতকারকের হাত ধরে শত বছরের এ প্রথা এখনো টিকে আছে, যদিও আগের মতো জৌলুস আর নেই।
পয়লা বৈশাখ এলেই লাল কাপড়ে মোড়ানো নতুন খাতার চাহিদা বাড়ে। পুরোনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন হিসাব শুরু করার এই রীতি এখন অনেকটা প্রতীকী হলেও অনেক ব্যবসায়ীর কাছে এটি এখনও আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ।
টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও হালখাতা তৈরির ব্যস্ততা দেখা যায়। কর্ণফুলী আর্ট অ্যান্ড বাইন্ডিং হাউসের স্বত্বাধিকারী পঙ্কজ দাশ জানান, একসময় ছোট-বড় প্রায় সব ব্যবসায়ী লাল কাপড়ে মোড়ানো খাতায় হিসাব রাখতেন। এখন অনেকেই কম্পিউটার ব্যবহার করলেও স্বর্ণ ব্যবসায়ী, মুদি দোকানি ও আড়তদারদের মধ্যে এখনও হালখাতার প্রচলন রয়েছে। তার মতে, কাগজের খাতায় হিসাব সহজে পরিবর্তন করা যায় না, তাই অনেকেই এটিকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন।
খাতাঘর-এর স্বত্বাধিকারী নয়ন ঘোষ বলেন, বর্তমানে ৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে হালখাতা বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই এখনও লাল রঙকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন, ফলে লাল খাতার চাহিদা তুলনামূলক বেশি। তবে তিনি স্বীকার করেন, আগের মতো এখন আর নিমন্ত্রণ, মিষ্টিমুখ বা বড় আয়োজন দেখা যায় না।
মোবাইল ব্যাংকিং, নগদ লেনদেন এবং বাকির পরিমাণ কমে যাওয়ায় হালখাতার মূল উদ্দেশ্যও অনেকটাই বদলে গেছে।
ঐতিহাসিকভাবে হালখাতার সূচনা মুঘল আমলে সম্রাট আকবরের সময় বলে ধারণা করা হয়। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে সহজ করতে বাংলা সন চালুর পর থেকেই বছরের শুরুতে হিসাব হালনাগাদের এ প্রথা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ‘হাল’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ নতুন। পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলার রীতি থেকেই এর নাম ‘হালখাতা’।
একসময় ‘সরকার’ নামে পরিচিত বিশেষ হিসাবরক্ষকরাও হালখাতার হিসাব সংরক্ষণ করতেন। তারা বড় খাতায় সারা বছরের লেনদেন লিপিবদ্ধ করতেন। এই পেশাটিও এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
আরেকটি হারিয়ে যাওয়া শব্দ ‘চৈত-কাবারি’, যা চৈত্র মাসের শেষের দেনা-পাওনার হিসাব বোঝাত। সময়ের পরিবর্তনে এসব শব্দ ও প্রথা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে অনেক ব্যবসায়ী ইংরেজি ক্যালেন্ডার ও ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে হিসাব রাখছেন। ফলে কাগজের খাতার ব্যবহার কমে গেলেও হালখাতার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এখনো রয়ে গেছে।
সব পরিবর্তনের মধ্যেও একটি বিষয় অটুট রয়েছে—হালখাতা শুধু হিসাবের খাতা নয়, এটি ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে বিশ্বাস, সম্পর্ক ও সৌহার্দ্যের প্রতীক। টাঙ্গাইলের কিছু প্রতিষ্ঠান ও কারিগরের হাত ধরে শত বছরের এই ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে।











