খবর বাংলা ডেস্ক :
হঠাৎ করেই নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটলে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন অভিভাবকরা। তবে চিকিৎসকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা নোজব্লিড গুরুতর কোনো রোগের লক্ষণ নয়। শুষ্ক আবহাওয়া, অ্যালার্জি, সর্দি-কাশি কিংবা নাক খোঁচানোর মতো সাধারণ কারণেই এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে বারবার নাক দিয়ে রক্ত পড়া শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা জটিল রোগেরও ইঙ্গিত হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় নাক দিয়ে রক্ত পড়াকে বলা হয় ‘এপিস্ট্যাক্সিস’। নাকের ভেতরে অসংখ্য সূক্ষ্ম রক্তনালি থাকে, যা শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাসকে উষ্ণ ও আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। এসব রক্তনালি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সামান্য আঘাত বা শুষ্কতার কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং রক্তপাত শুরু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৬ জন নাক দিয়ে রক্ত পড়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রক্তপাত অল্প সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় এবং বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সাধারণ কারণ নাক দিয়ে রক্ত পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো শুষ্ক বাতাস। দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকা বা শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে নাকের ভেতরের আবরণ শুকিয়ে যায়। এতে টিস্যুতে ফাটল তৈরি হয় এবং রক্তনালিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে নাক ঝাড়া, ঘষা বা খোঁচানোর মতো সাধারণ কাজেও রক্তপাত হতে পারে।
এ ছাড়া সর্দি-কাশি, সাইনাসের সংক্রমণ, অ্যালার্জি, নাকে আঘাত পাওয়া, নাকের ভেতরে কোনো বস্তু ঢুকে যাওয়া কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে। যারা নিয়মিত অ্যাসপিরিন বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবন করেন, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা, লিউকেমিয়া, নাকের পলিপ বা টিউমারের মতো রোগও বারবার নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণ হতে পারে।
শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি দুই থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে নাক দিয়ে রক্ত পড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। কারণ এ বয়সে শিশুরা প্রায়ই নাক খোঁচায় বা নাকে বিভিন্ন বস্তু প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে।
অন্যদিকে ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তনালির পরিবর্তন এবং রক্ত পাতলা করার ওষুধ ব্যবহারের কারণে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। গর্ভাবস্থায়ও অনেক নারীর নাকের রক্তনালিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় রক্তপাত হতে পারে।
নাক দিয়ে রক্ত পড়লে কী করবেন? নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হলে প্রথমেই শান্ত থাকতে হবে। অনেকেই ভুল করে মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে দেন, যা চিকিৎসকদের মতে সঠিক নয়। এতে রক্ত গলার ভেতর দিয়ে পেটে চলে যেতে পারে এবং বমি বমি ভাব সৃষ্টি করতে পারে।
রক্তপাত হলে সোজা হয়ে বসে মাথা সামান্য সামনে ঝুঁকিয়ে রাখতে হবে। এরপর নাকের নরম অংশ দুই আঙুল দিয়ে চেপে ধরে ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। এ সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এভাবেই রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন? ১৫ থেকে ২০ মিনিট চাপ দেওয়ার পরও যদি রক্তপাত বন্ধ না হয়, যদি অতিরিক্ত রক্ত বের হয়, শ্বাস নিতে সমস্যা হয় অথবা মাথায় আঘাত পাওয়ার পর রক্তপাত শুরু হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
এ ছাড়া ঘন ঘন নাক দিয়ে রক্ত পড়া, শরীরে অস্বাভাবিক কালশিটে দাগ দেখা দেওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলেও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
প্রতিরোধে যা করবেন নাক দিয়ে রক্ত পড়া প্রতিরোধে ঘরের বাতাস আর্দ্র রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং নাক খোঁচানোর অভ্যাস ত্যাগ করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ধূমপান এড়িয়ে চলা, অ্যালার্জির যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া এবং নাক ঝাড়ার সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
নাক দিয়ে রক্ত পড়া সাধারণত উদ্বেগের কারণ না হলেও বারবার এমন হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কারণ এটি শরীরের অন্য কোনো সমস্যার সতর্ক সংকেতও হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ










