খবরবাংলা ডেস্ক :
সারাদিন বসে কাজ করা, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি। উদ্বেগের বিষয় হলো, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলেও প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের শরীরে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে দীর্ঘদিন অজান্তেই থেকে যেতে পারে এই সমস্যা।
ফ্যাটি লিভার হলেই কি লিভার ক্যান্সার হয়? চিকিৎসকদের মতে, বিষয়টি এমন নয়। তবে লিভারে চর্বি জমার পাশাপাশি প্রদাহ ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি হলে ভবিষ্যতে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ভারতের সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ফ্যাটি লিভার কীভাবে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়?
লিভারে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চর্বি জমাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। এর একটি বড় অংশের সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন, ইনসুলিন প্রতিরোধ, ডায়াবেটিস এবং বিপাকীয় সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে লিভারে জমে থাকা চর্বি থেকে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন প্রদাহ চলতে থাকলে লিভারের কোষে ক্ষত সৃষ্টি হয়, যা ফাইব্রোসিস নামে পরিচিত। ক্ষতি আরও বাড়লে তা সিরোসিসে রূপ নিতে পারে। সিরোসিস লিভার ক্যান্সারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।
তবে ফ্যাটি লিভার থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির লিভারে প্রদাহ, সিরোসিস কিংবা ক্যান্সার হয় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে সিরোসিস ছাড়াও লিভার ক্যান্সার হতে পারে। তাই রোগের পর্যায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
লিভারের সমস্যায় যে ৭টি লক্ষণ অবহেলা করবেন না
ফ্যাটি লিভার ও লিভার ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে রোগের অগ্রগতির সঙ্গে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলেই ক্যান্সার হয়েছে—এমন নয়; তবে এগুলো স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
১. অকারণে ওজন কমে যাওয়া
খাদ্যাভ্যাস বা শরীরচর্চায় পরিবর্তন না এনেও অল্প সময়ে ওজন কমতে থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিন। অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাস লিভারের সমস্যা ছাড়াও বিভিন্ন রোগের লক্ষণ হতে পারে।
২. ক্ষুধামন্দা
দীর্ঘদিন খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি কিংবা ক্ষুধা না লাগার সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে এর সঙ্গে ওজন কমে গেলে অবহেলা করবেন না।
৩. দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা
পেটে দীর্ঘদিন ব্যথা থাকা বা বারবার ব্যথা ফিরে আসার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। ব্যথা স্থায়ী হলে বা ক্রমে বাড়তে থাকলে পরীক্ষা করিয়ে কারণ জানা প্রয়োজন।
৪. পেটের ডান দিকে ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি
লিভার পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে অবস্থিত। এ জায়গায় বারবার ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি অনুভূত হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। তবে এ ধরনের অস্বস্তি মানেই লিভারের গুরুতর রোগ নয়।
৫. পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া
লিভারের উন্নত পর্যায়ের রোগে পেটে তরল জমে পেট ফুলে যেতে পারে। পেট অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে গেলে, বিশেষ করে এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট থাকলে, দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
৬. চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
চোখের সাদা অংশ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়াকে জন্ডিস বলা হয়। লিভার বা পিত্তনালির বিভিন্ন সমস্যায় এ লক্ষণ দেখা দিতে পারে। চোখ বা ত্বক হলুদ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৭. অস্বাভাবিক ক্লান্তি
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও দীর্ঘদিন ক্লান্ত লাগা, শরীরে শক্তি না পাওয়া কিংবা দৈনন্দিন কাজে আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিন। ক্লান্তির অনেক কারণ থাকতে পারে, তাই প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো উচিত।
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে কী করবেন?
ফ্যাটি লিভার শনাক্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে রোগের পর্যায় ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভারের কার্যকারিতা, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং লিভারে ক্ষত তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম বা লিভারের ফাইব্রোসিস নির্ণয়ের পরীক্ষা করা হয়। সবার জন্য একই ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না; ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে যেসব অভ্যাস জরুরি
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ধীরে ধীরে ওজন কমানোর চেষ্টা করুন।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: প্রতিদিন হাঁটা এবং অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রমের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
সুষম খাবার খান: অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয় ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার কমিয়ে শাকসবজি, ফল, আঁশযুক্ত খাবার এবং পরিমিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন।
ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন: রক্তে শর্করা ও চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নিজে থেকে ওষুধ বা ভেষজ উপাদান ব্যবহার করবেন না: লিভার ভালো করার নামে অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ফ্যাটি লিভার একটি পরিচিত স্বাস্থ্যসমস্যা হলেও একে অবহেলা করা ঠিক নয়। একইভাবে, ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লেই লিভার ক্যান্সার হবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে লিভারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।










