মো: জিসান রহমান
,
মাভাবিপ্রবি প্রতিনিধি :
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছু বিদায় শব্দে প্রকাশ করা যায় না। শেষবারের মতো বিভাগের করিডোরে হাঁটা, পরিচিত বেঞ্চে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকা, বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে বলা—”ভালো থাকিস”—এসব মুহূর্তই বলে দেয়, জীবনের একটি সুন্দর অধ্যায় শেষ হতে চলেছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা প্রজেক্ট ডিফেন্স সম্পন্ন করে তাদের স্নাতক জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টেনেছেন। ২০২২ সালের ২৭ মার্চ যে পথচলা শুরু হয়েছিল নতুন স্বপ্ন, অজানা আশঙ্কা আর অসংখ্য সম্ভাবনা নিয়ে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এসে সেই পথচলার ইতি ঘটল।
ডিফেন্স শেষ হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করেছে বিভাগের করিডোর। যে আঙিনায় প্রতিদিন প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর থাকত ১৬তম ব্যাচ, সেখানে এখন বিদায়ের নীরবতা। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছেড়ে নতুন জীবনের পথে পা বাড়াচ্ছেন। কেউ দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে পেশাজীবন শুরু করবেন, কেউ চাকরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হবেন, কেউ আবার উচ্চশিক্ষার জন্য নতুন গন্তব্যে পাড়ি জমাবেন। আর কয়েকজন একই বিভাগে মাস্টার্স করার জন্য প্রিয় ক্যাম্পাসেই থেকে যাবেন। পাশাপাশি তাঁরা সরকারি চাকরির প্রস্তুতিও নেবেন। মাস্টার্স শেষ হলে তাঁরাও একদিন এই প্রিয় ক্যাম্পাস ছেড়ে নতুন গন্তব্যে পা বাড়াবেন।
আজ যারা বিদায় নিচ্ছেন, কয়েক বছর পর তাঁদের মধ্য থেকেই কেউ হবেন একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের এজিএম বা জিএম, কেউ বিসিএস ক্যাডার, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, আবার কেউ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেবেন। আজকের এই বিদায় তাই কেবল বিচ্ছেদ নয়; এটি অসংখ্য স্বপ্নের যাত্রার শুরু।
চার বছরেরও বেশি সময়ে সহপাঠীরা শুধু বন্ধু ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন একে অপরের পরিবারের সদস্য। একই ক্লাসরুম, একই ল্যাব, পরীক্ষার আগের উৎকণ্ঠা, রাত জেগে প্রজেক্ট শেষ করা, ক্যান্টিনের আড্ডা, ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণে জমে থাকা হাসি, অভিমান আর অসংখ্য স্মৃতি—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য বন্ধন। সেই বন্ধন ছিন্ন করে বিদায় বলা সহজ নয়।
এই বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে ২০ জুলাই রাতে ১৬তম ব্যাচের উদ্যোগে খাসির ভোজের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিভাগের শিক্ষক এবং ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। প্রাণখোলা আড্ডা, স্মৃতিচারণ, হাসি আর ভবিষ্যতের স্বপ্নে মুখর ছিল পুরো সন্ধ্যা। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বদলে যায় পরিবেশ। কেউ শেষবারের মতো বন্ধুদের জড়িয়ে ধরেন, কেউ দলবদ্ধ ছবি তুলে স্মৃতি বন্দী করেন, আবার কেউ নীরবে চোখের জল মুছে নেন।
বিদায়ী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বিভাগের শিক্ষকরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়; এটি মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলারও পাঠশালা। জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে সততা, দক্ষতা ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে এগিয়ে গেলে সাফল্য একদিন ধরা দেবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারে এটি হয়তো আরেকটি ব্যাচের বিদায়। কিন্তু যারা চলে যাচ্ছেন, তাঁদের কাছে এটি কেবল একটি ডিগ্রির সমাপ্তি নয়; এটি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়কে পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্নের পথে যাত্রা। আগামী দিনে ব্যস্ততা বাড়বে, ঠিকানা বদলাবে, পরিচয় বদলাবে। হয়তো প্রতিদিন আর দেখা হবে না, একই বেঞ্চে বসা হবে না, রাতভর আড্ডাও হবে না। তবু কোনো এক অবসরে পুরোনো ছবিগুলো দেখে হয়তো আবার মনে পড়বে—এই ক্যাম্পাসেই প্রথম স্বপ্ন দেখতে শিখেছিলেন, এই মানুষগুলোর সঙ্গেই ভাগ করে নিয়েছিলেন জীবনের সবচেয়ে নির্মল সময়।
সময় একদিন সবাইকে আলাদা করে দেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুত্ব, স্মৃতি আর ভালোবাসা কোনো সমাবর্তন, কোনো বিদায় কিংবা কোনো দূরত্বে শেষ হয় না। সেগুলো আজীবন থেকে যায় হৃদয়ের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় হয়ে।











