খবরবাংলা ডেস্ক :
দাম্পত্য বা প্রেমের সম্পর্কের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে আবেগীয় কিংবা শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াকে সাধারণভাবে পরকীয়া বলা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি নিয়ে সামাজিকভাবে নানা আলোচনা থাকলেও প্রশ্ন উঠছে—পরকীয়া কি মানুষের স্বাভাবিক আচরণের অংশ, নাকি এটি কোনো মানসিক সমস্যার লক্ষণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পরকীয়ায় জড়িত থাকার কারণে কাউকে মানসিক রোগী বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরকীয়া মূলত সম্পর্কগত, ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাস আইসিডি-১১ অনুযায়ী, কোনো আচরণকে মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হলে নির্দিষ্ট চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে ব্যক্তির উল্লেখযোগ্য মানসিক কষ্ট, আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো কিংবা দৈনন্দিন জীবন ও কার্যক্রমে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাবের মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়।
কখন মানসিক সমস্যার বিষয়টি সামনে আসতে পারে?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে যৌন বা সম্পর্কগত আচরণ এতটাই পুনরাবৃত্তিমূলক এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে যে তা ব্যক্তি ও তার আশপাশের মানুষের জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলে।
আইসিডি-১১-এ এমন পরিস্থিতির জন্য কম্পালসিভ সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার (সিএসবিডি) নামে একটি আচরণগত ও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত শ্রেণি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগের ‘অতিরিক্ত যৌন তাড়না’ ধারণাটিকে পুনর্গঠন করে এই শ্রেণিবিন্যাস করেছে।
তবে সিএসবিডি এবং পরকীয়া এক বিষয় নয়। কেউ পরকীয়ায় জড়িয়েছেন মানেই তার সিএসবিডি রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
পরকীয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?
সম্পর্কের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। যেমন—
- দাম্পত্য সম্পর্কে দীর্ঘদিনের সমস্যা
- আবেগীয় দূরত্ব ও যোগাযোগের ঘাটতি
- সম্পর্ক নিয়ে অসন্তুষ্টি
- নতুনত্ব বা উত্তেজনার প্রতি আকর্ষণ
- ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়
- সম্পর্কের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়া
- কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন যৌন আচরণ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যার উপস্থিতি
তবে এসব কারণের কোনো একটিকে সব পরকীয়ার জন্য দায়ী করা যায় না। ব্যক্তি, সম্পর্ক ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কারণ ভিন্ন হতে পারে।
‘মানসিক রোগ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া কেন ঠিক নয়?
মানসিক রোগ একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়। আইসিডি-১১-এ বিভিন্ন মানসিক ও শারীরিক রোগ নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড রয়েছে। তাই কারও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সিদ্ধান্ত বা ভুল আচরণকে সরাসরি মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।
একই সঙ্গে কারও আচরণের পেছনে প্রকৃত মানসিক বা আচরণগত সমস্যা থাকার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
যদি কারও যৌন বা সম্পর্কগত আচরণ বারবার ঘটে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং এর কারণে পরিবার, সম্পর্ক, পড়াশোনা, কর্মজীবন কিংবা দৈনন্দিন জীবনে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
সুতরাং, পরকীয়া নিজে কোনো মানসিক রোগ নয়। এটি মূলত একটি সম্পর্কগত ও ব্যক্তিগত আচরণ। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সঙ্গে মানসিক বা আচরণগত সমস্যা যুক্ত থাকতে পারে। তাই শুধু পরকীয়ায় জড়িত থাকার কারণে কাউকে ‘মানসিক রোগী’ না বলে প্রয়োজন অনুযায়ী তার আচরণ ও মানসিক অবস্থার পেশাদার মূল্যায়ন করা উচিত।











