খবরবাংলা ডেস্ক :
মানসিক চাপ শুধু মনের ওপরই প্রভাব ফেলে না, বদলে দিতে পারে খাওয়ার অভ্যাসও। দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের সময় কেউ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবার খেতে শুরু করেন। বিশেষ করে মিষ্টি, ভাজাপোড়া ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যেতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে মানসিক চাপের কারণে ক্ষুধা কমে যায়, অনিয়মিত হয়ে পড়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস।
দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে শারীরিক ক্লান্তির পাশাপাশি খাবার নিয়ে অপরাধবোধ ও মানসিক অস্বস্তিও তৈরি হতে পারে। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক সমস্যা, একাকিত্ব কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের নানা উদ্বেগ এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপের কারণে খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তনকে শুধু ইচ্ছাশক্তির অভাব হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এর সঙ্গে মানসিক সুস্থতা, ঘুমের ধরন এবং দৈনন্দিন জীবনের চাপ সামলানোর পদ্ধতির সম্পর্ক রয়েছে।
মানসিক চাপে খাওয়ার অভ্যাস বদলে যায় কেন? মানসিক চাপের সময় শরীরে বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। এ সময় অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো হরমোনের ভূমিকা থাকে। স্বল্পমেয়াদি চাপে কারও ক্ষুধা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আকর্ষণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
এ সময় অনেকের মিষ্টি, ভাজাপোড়া, চর্বিযুক্ত খাবার কিংবা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার ইচ্ছা বাড়ে। এসব খাবার সাময়িক আনন্দ বা স্বস্তি দিতে পারে। তবে সেই অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। কিছুক্ষণ পর আবার খাবার খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কিংবা মানসিক অস্বস্তি ফিরে আসতে পারে।
মানসিক চাপ ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ফলে ক্ষুধা ও পেট ভরে যাওয়ার স্বাভাবিক সংকেত বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অনিয়মিত ঘুমের সঙ্গে খাবারের অনিয়ম যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
খাবার খাওয়ার পর অপরাধবোধ তৈরি হয় কেন? কঠিন কোনো দিন শেষে পছন্দের খাবার খেলে সাময়িকভাবে মন ভালো লাগতে পারে। মানসিক অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে কেউ কেউ বারবার খাবারের আশ্রয় নেন। একই অভিজ্ঞতা বারবার ঘটলে চাপের মুহূর্তে খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
সমস্যা দেখা দেয় যখন খাওয়ার পর নিজের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। কেউ কী খেয়েছেন বা কতটা খেয়েছেন, তা নিয়ে নিজেকে দোষারোপ করতে থাকেন। এরপর কম খাওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই নিয়ম মানতে না পারলে আবারও অপরাধবোধ তৈরি হতে পারে।
এভাবে মানসিক চাপ থেকে বেশি খাওয়া, খাওয়ার পর অনুশোচনা এবং পরে নিজেকে কঠোর নিয়মে বাঁধার চেষ্টা—একটি চক্র তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পছন্দের খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া কিংবা নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করার পরিবর্তে কেন এমন হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
মানসিক চাপে কারও ক্ষুধা কমে যায় কেন? মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কেউ বেশি খাবার খান, আবার কেউ খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, হজমের অস্বস্তি কিংবা বমি বমি ভাবের কারণে কারও খেতে ইচ্ছা নাও করতে পারে। আবার কাজের চাপ বা নানা চিন্তায় ব্যস্ত থাকায় কেউ সময়মতো খাওয়ার কথাও ভুলে যান।
ঘুমের ধরন, শারীরিক অবস্থা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং চাপ সামলানোর পদ্ধতিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘদিন খাবার অনিয়মিত হলে শরীরে ক্লান্তি বাড়তে পারে, মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে এবং দৈনন্দিন কাজেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই ক্ষুধা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ী হলে অবহেলা করা উচিত নয়।
কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন? কঠিন কোনো সময়ের মধ্যে সাময়িকভাবে ক্ষুধা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিলে এবং তা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
খাওয়ার পর অতিরিক্ত অপরাধবোধ, খাবার নিয়ে ভয় বা লজ্জা, বারবার ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার বাদ দেওয়া কিংবা খাওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি সতর্কসংকেত হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, মন খারাপ, মানসিক ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতিও মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এ ছাড়া ওজনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা অন্য শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষুধার পরিবর্তন দীর্ঘদিন চললে কিংবা কাজ, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া উচিত।
খাবারের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়বেন যেভাবে মানসিক চাপের কারণে খাওয়ার অভ্যাস বদলে গেলে প্রথমেই নিজেকে দোষারোপ না করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। খাবার খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হলে ভেবে দেখা যেতে পারে, সত্যিই ক্ষুধা লেগেছে কি না, আগের কোনো বেলা বাদ পড়েছে কি না, নাকি কোনো দুশ্চিন্তা থেকে খাবার খেতে ইচ্ছা করছে।
খাবারের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে কয়েকটি অভ্যাস সহায়ক হতে পারে— নিয়মিত খাবার খান: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এড়িয়ে চলুন এবং প্রতিদিনের খাবারের রুটিন বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন: খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, শাকসবজি, ফল ও আঁশযুক্ত খাবার রাখুন।
পর্যাপ্ত ঘুমান: নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন। শরীরচর্চা করুন: হাঁটাচলা ও উপযুক্ত শারীরিক কার্যক্রম মানসিক চাপ সামলাতে সহায়তা করতে পারে।
নিজের জন্য সময় রাখুন: বিশ্রাম নিন এবং বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে নিজের উদ্বেগ নিয়ে কথা বলুন।
প্রয়োজনে সহায়তা নিন: খাবার নিয়ে ভয়, অপরাধবোধ বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
মানসিক চাপের কারণে খাবার খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন আসা মানেই দুর্বলতা নয়। নিজের মানসিক অবস্থার প্রতি সচেতন থাকা, নিয়মিত জীবনযাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তা নেওয়ার মাধ্যমে খাবারের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ











